খোকন কোড়ায়া রিক্সা থেকে নেমে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের দিকে দৌঁড়াতে থাকে শিমুল। দুপুর একটা চল্লিশ। আর পাঁচ মিনিট পরেই ঢাকা-বান্দুরা রুটের মুন্নী লঞ্চটি ছেড়ে যাবে। দুপুর বারোটার দিকে বসের কাছ থেকে আধা বেলার ছুটি নিয়ে মেসে গিয়েছিলো শিমুল। বাংলামটরের একটা পেট্রোল পাম্পে হিসাব রক্ষকের চাকরি করে শিমুল। থাকে পূর্ব রাজাবাজারের একটা মেসে। মেসে গিয়ে তাড়াহুড়ো […]
খোকন কোড়ায়া
রিক্সা থেকে নেমে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের দিকে দৌঁড়াতে থাকে শিমুল। দুপুর একটা চল্লিশ। আর পাঁচ মিনিট পরেই ঢাকা-বান্দুরা রুটের মুন্নী লঞ্চটি ছেড়ে যাবে। দুপুর বারোটার দিকে বসের কাছ থেকে আধা বেলার ছুটি নিয়ে মেসে গিয়েছিলো শিমুল। বাংলামটরের একটা পেট্রোল পাম্পে হিসাব রক্ষকের চাকরি করে শিমুল। থাকে পূর্ব রাজাবাজারের একটা মেসে। মেসে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে কিছু ভাত পেটে ঢুকিয়ে ব্যাগ কাধে নিয়ে মসজিদের সামনে থেকে রিক্সা নিয়ে সদরঘাটের দিকে রওনা হয়েছিলো শিমুল।
লঞ্চের কাছে পৌঁছে শিমুল দেখে ‘মুন্নি-২’ লঞ্চটি ততক্ষণে টার্মিনাল থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ভেঁপু বাজিয়ে ছুটে চলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। লঞ্চ আর টার্মিনালের দূরত্ব তখনও খুব বেশী নয়, দু’হাতের মত হবে। শিমুল এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে ব্যাগটা ছুড়ে মারে লঞ্চের ডেকে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন যাত্রী লুফে নেয় সেটা। এরপর দর্শনীয় একটি লাফ দিয়ে উঠে যায় লঞ্চে। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিলো শিমুল, লঞ্চের সুকানি ধরে ফেলে ওকে। ওর এই এ্যাডভেঞ্চার যাত্রীরা বেশ উপভোগ করে, অল্প বয়সের কয়েকটি ছেলে হাততালি দেয়।
আপার ক্লাসে খুব একটা ভীড় নেই, বসার জায়গা পেতে সমস্যা হল না। মধ্য অক্টোবরেও গরম ততটা কমেনি, রীতিমত ঘেমে গেছে শিমুল। আরাম করে বসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেয় ও। তারপর এক কাপ চায়ের অর্ডার দেয়। মুন্নি লঞ্চের চা-টা আসলেই এ ক্লাস। তৃপ্তি সহকারে চা খেতে খেতে সিগারেটের নেশা পায় শিমুলের। কিন্তু আপার ক্লাসেতো সিগারেট খাওয়া যাবে না। তাই বাইরে গিয়ে লঞ্চের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরায় ।
এ বছরই ফেব্রুয়ারিতে জুঁইকে বিয়ে করেছে শিমুল। না প্রেমের বিয়ে নয়, তবে বিয়ের আগে চুটিয়ে প্রেম করেছে ওরা। শিমুলের মা বাবা যখন শিমুলের জন্য পাত্রী খুঁজতে খুঁজতে হয়রান ঠিক তখনই ওর এক বন্ধুর আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে জুঁইকে দেখে শিমুল। এবং দেখে ওর মনে হয় বউ হিসেবে যে নারীর ছবি ওর মনের ক্যানভাসে এঁকে রেখেছে এতো সে-ই। বন্ধুর কাছ থেকে খবর নিয়ে ও জানতে পারে জুঁই’র বাড়ি ওদের পাশের গ্রামেই, আত্মীয়ের বাসায় থেকে ঢাকার লালমাটিয়া কলেজে পড়ে। এর দিন পনের পরেই বাবা মা আর বোন দু’একজন মুরুব্বি নিয়ে শিমুলের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে জুঁইদের বাড়ী যায়। জুঁইয়ের বাবা মা কিছুদিন সময় নেয় তাদের মতামত জানানোর জন্য। সে সময়টা খুবই টেনশনে কেটেছে শিমুলের। অবশ্য যথাসময়ে সবুজ সংকেত পাওয়া যায় জুঁইদের বাড়ি থেকে। এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ডালা খাওয়ার মধ্য দিয়ে ওদের এনগেজমেন্ট হয়ে যায়। আর এনগেজমেন্ট হয়ে যাওয়ার পরই ওরা সুযোগ পায় মেলামেশা করার, একে অপরকে জানার, বোঝার। আসলে এনগেজমেন্টের পর থেকে বিয়ের আগ পর্যন্ত এই একটি বছর ওদের খুবই চমৎকার কেটেছে। খুবই লাজুক প্রকৃতির ছেলে শিমুল, লজ্জার কারণেই কোন মেয়ের সঙ্গে প্রেম করা হয়ে ওঠেনি ওর। এ সময়টায় কিছুটা হলেও প্রেমের স্বাদ গ্রহণ করে ওরা।
লঞ্চ ততক্ষণে ফতুল্লাপার হয়ে বুড়ীগঙ্গা, শীতলক্ষা আর ধলেশ্বরী এই তিন নদীর মোহনায় চলে এসেছে। এখানে স্রোত আর ঢেউ দু’টোই বেশি। ঢেউয়ের তালে দুলছে লঞ্চ । আর লঞ্চের সঙ্গে দুলছে শিমুলের হদয়। জুঁইয়ের মুখটা বার বার ভেসে উঠছে ওর মনে। ওকে দেখে ভীষণ অবাক আর খুশী হবে জুঁই, পাল্টে যাবে ওর মুখের রেখাগুলো। জুঁইয়ের পাল্টে যাওয়া সেই হাসিমাখা সুন্দর মুখটা কল্পনা করে আপন মনে হাসতে থাকে শিমুল।
বিয়ের আগে শিমুল জুঁইকে বলেছিলে – বিয়ের পর তোমাকে কিন্তু আমি ঢাকায় রাখতে পারবো না। ছোট চাকরি করি, সে সামর্থ আমার নেই। তোমাকে আমার বাবা মার সঙ্গে গ্রামেই থাকতে হবে।
জুঁই হেসে বলেছিলো – আমিতো গ্রামেরই মেয়ে, কলেজে পড়ার জন্য ঢাকায় এসেছি। গ্রামে থাকতে আমার কোন অসুবিধা হবে না। এটা নিয়ে তুমি একদম টেনশন করবে না। তাছাড়া তুমিতো মাঝে মাঝে বাড়িতে যাবেই, তাই না?
– যাব মানে প্রত্যেক সপ্তায়ই যাবো।
– প্রত্যেক সপ্তায় যেতে হবে না মিস্টার, এক মাস পর পর গেলেই চলবে।
লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বিয়ের পর প্রথম তিন মাস প্রতি সপ্তায়ই বাড়ি যেতো শিমুল। ছুটি না পেলে বৃহস্পতিবার হাফ অফিস করে বাড়ি যেতো, আবার শুক্রবার দুপুরের লঞ্চেই ফিরে আসতো ঢাকায়। এর পর থেকে এ পর্যন্ত মাসে দু’বার করে বাড়ী যায় শিমুল। গত সপ্তাহে যেহেতু গিয়েছিলো তাই এ সপ্তাহে ওর বাড়ি যাওয়ার কথা না। কিন্তু দু’দিন থেকে বাড়ির জন্য মনটা কেমন উতলা হয়ে আছে। তাছাড়া বাবা মা আর জুঁইকে একটা সুখবরও দেয়ার আছে। ছুটি নেই তাই কাল লাস্ট লঞ্চেই আবার ফিরতে হবে।
সৈয়দপুর ঘাটে লঞ্চ ভিড়লো। নেমে গেলো বেশ কিছু যাত্রী। আবার কিছু লোকাল প্যাসেঞ্জার উঠলো যারা নবাবগঞ্জ বা বান্দুরা যাবে। সঙ্গে উঠলো ঝালমুড়িওয়ালা তোতা মিয়া। ঢাকা-বান্দুরা রুটের ঝালমুড়ি খুবই উপাদেয়। আর যদি সেটা হয় তোতামিয়ার হাতের তবেতো কথাই নেই । এই ঝালমুড়ির স্বাদ যে একবার পেয়েছে সারা জীবনে ভুলবে না। দুপুরে তাড়াহুড়োর মধ্যে কোন রকমে খেয়ে বেরিয়েছে শিমুল। পেট জানান দিচ্ছে শিমুল ক্ষুধার্থ। তোতা মিয়া আপার ক্লাসে ঢোকার আগেই অর্ডার দেয় শিমুল – কাকা একটা মুড়ি দাও, পেঁয়াজ বেশি করে দিও। মুড়ি খেতে খেতে আর একটা চায়ের অর্ডায় দেয় শিমুল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। নদীর দু’পাশের চিরচেনা দৃশ্যগুলো চির নতুনকে দেখার আনন্দ নিয়ে দেখতে থাকে শিমুল।
নদীর পাশে কাশফুলের শুভ্রতা। লাঙ্গল কাঁধে ঘরে ফিরছে কৃষক। নদীতে বড়শী ফেলে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এক বৃদ্ধ। নদীর ঘাটে ডুব দিয়ে স্নান করছে এক গরীব পরিবার। হয়তো স্নানের পরে তারা যে খাবারটা খাবে সেটা তাদের লাঞ্চ কাম ডিনার। রঙ্গীণ শাড়ী পরে নদী তীরের রাস্তা দিয়ে নাচের ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে দুই কিশোরী, হয়তো পাশের গ্রামে তারা বেড়াতে গিয়েছিলো।
দাদা আপনার ভাড়াটা………। চারপাশে অন্ধকার নেমে আসছে দ্রুত। ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে গিয়ে বসে শিমুল।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময় লঞ্চ বান্দুরা ঘাটে ভিড়লো। লঞ্চ থেকে নেমে নৌকা ঘাটের দিকে পা বাড়ায় শিমুল। এই সময়ে তুইতাল যাওয়ার নৌকা পাবে কি না এটা নিয়ে চিস্তিত হয়ে পড়ে ও।
বেশ কয়েকটি নৌকা ঘাটে বাঁধা রয়েছে। নৌকাগুলির উপর টর্চের আলো ফেলে গলার স্বর উঁচুতে তুলে শিমুল বলে – তুইতাল যাইবেননি কেউ?
– আরে শিমুল ভাইস্তা না? আস আস……..। ধলা মাঝির কন্ঠে আন্তরিকতার ছোঁয়া।
নৌকা থেকে নেমে শিমুলের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে ধলা মাঝি বলে – চল নৌকায় চল। মনে করছিলাম আইজকা খালি নাও নিয়াই বাড়ি যাওয়ন লাগবো, তোমারে পাইয়া ভালই হইলো।
নৌকায় উঠে একটা সিগারেট ধরায় শিমুল। আর একটা ধলা মাঝির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে – কাকা চলবো নাকি একটা?
– দেও একটা, তয় তোমার ঔ ক্যাপাস্টেন টাইনা মজা পাইনা, ঘাসের মতন লাগে।
– কাকা নৌকা কি আমাগো বাড়ির ঘাটে যাইবো?
– না, পানি কইমা গেছে, নাও ধনাই কুরুজের বাড়ি পর্যন্ত যাইবো। চিন্তা নাই, আমিতো তোমাগো বাড়ির কাছ দিয়াই যামু, হারিকেন দিয়া তামারে বাড়িকে দিয়া যামুনে। তা বাবা ঢাকায় আবার ফিরবা কবে?
– কাইলকাই ফিরতে হইবো, ছুটি নাই,আইছি খালি একটা জরুরী কাজে।
– কুনসোম যাইবা কাইলকা ?
– দু’ইটার লঞ্চে।
– ঠিক আছে, আমি বারটার সময় তোমাগো বাড়ি আসবোনে।
ছইওয়ালা কেরায়া নৌকা ধলা মাঝির। পঞ্চাশোর্দ্ধ ধলা মাঝি তার পারদর্শী হাতে বৈঠা বেয়ে চলেছে। ইছামতির বুক চিরে মন্থর গতিতে এগিয়ে চলেছে নৌকা। আজ বোধহয় পূণির্মা , চাঁদের রূপালী আলো খেলা করছে নৌকার ছইয়ে, নৌকার গলুইয়ে আর ঢেউয়ের বুকে। নৌকার ছইয়ের ভিতরে মাদুর বিছানো আছে। মাথার নিচে ব্যাগ রেখে শুয়ে পড়ে শিমুল।
একটু তন্দ্রার মত এসে গিয়েছিলো। ধলা মাঝির গানে ঘোর কাটে – কাইন্দা আকুল হইলামরে ব্যাকুল বইসা নদীর কূলেরে আমায় কে-বা পার করে।
রাত নটার দিকে রাড়ি পৌঁছে শিমুল। গ্রামে রাত নটা মানে মধ্য রাত। ওদের পাড়ার সব বাড়িই সুনসান অন্ধকার। কোন কোন ঘরে শুধু ডিমডিম করে কুপি বা হারিকেন জ্বলছে। জোরে জোরে দরজার কড়া নেড়ে ডাকতে থাকে শিমুল – বাবা দরজা খোল, মা দরজা খোল। বাবার গলা ভেসে আসে- কে? ক্যারা?
– আমি শিমুল বাবা, দরজা খোল।
দরজা খুলে শিমুলকে দেখে অবাক হয় মা – বাবা তুমি হঠাৎ এত রাইতে?
– হাফ অফিস করে লঞ্চে উঠেছি…..তোমাদের কথা মনে পড়ছিলো খুব তাই চলে এলাম। তাছাড়া একটা খবরও আছে।
মা বরাবরের মত কোন খারাপ খবরের আশংকায় আতঙ্কিত হয়ে বলে – কি খবর বাবা?
– তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন মা, খারাপ খবর না, খুব ভাল খবর। বাবা তোমাদের বলেছিলাম না ওয়ার্ল্ড ভিশন নামের একটা এনজিওতে আমি ইন্টারভিউ দিয়েছি, ওখান থেকে কাল চিঠি এসেছে ওরা আমাকে সিলেক্ট করেছে, ডিসেম্বরের এক তারিখে জয়েন করতে বলেছে।
মার পিছনে বাবা, বাবার পিছনে জুঁই। বাবা সামনে এসে বলে – খুবই ভাল খবর, আনন্দের খবর। পরে বিস্তারিত শুনবো, ধলা ভাইরে বিদায় কইরা তুই ঘরে আয়।
ধলা মাঝিকে টাকা দিয়ে বিদায় করে ঘরে ঢুকে শিমুল।
বাবা গামছা এগিয়ে দিয়ে বলে – লুঙ্গি আনছস, নাকি আমার একটা দিমু।
– আনছি বাবা, ব্যাগে আছে।
– তাইলে যা বাইরে বালতিতে পানি আছে , হাতমুখ ধুয়ে আয়।
– হঠাৎ করে আইলি বাবা, আমাগোতো খাওয়া শেষ, এখন তোরে যে কি খাইতে দেই। শিমুলের বাবা, তুমি হারিকেনটা নিয়া আমার সঙ্গে একটু রান্নাঘরে চল, দেখি কি করা যায়। আর বৌমা তুমি স্টোভ ধরাইয়া শিমুলরে একটু চা কইরা দাও।
– এত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নাই মা, ঘরে যা আছে তাই দাও।
বাবা-মা রান্না ঘরের দিকে যেতেই জুঁইকে জড়িয়ে ধরে শিমুল। জুঁই ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে বলে – এই কি হচ্ছে, ছাড়, ছাড় না, যে কোন সময় মা ঘরে আসতে পারে।
শিমুল হেসে বলে – আমার মা অতটা বোকা না, ঘরে ঢুকলে শব্দ করেই ঢুকবে।
জুঁই স্টোভ জ্বালিয়ে হাড়িতে চায়ের পানি বসিয়ে শিমুলের দিকে তাকিয়ে বললো – আচ্ছা সত্যি করে বলতো আজ হঠাৎ চলে আসলে কেন, তোমারতো আগামী সপ্তাহে আসার কথা।
শিমুল দরজার দিকে একবার তাকিয়ে নিজের ঠোট দিয়ে জুঁইয়ের ঠোটে আলতোভাবে স্পর্শ রেখে বললো – সত্যি কথা বলবো, এসেছি বউকে আদর করতে।
– তুমি আরো বেশী দুষ্টু হয়েছো।
চা বানানো হলে রান্নাঘর থেকে বাবাকে ডেকে আনে শিমুল। জুঁই চলে যায় রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করার জন্য আর বাপ-ব্যাটা বারান্দায় বসে চা খায়।
– ওয়ার্ল্ড ভিশনের চাকরিটা তাইলে শেষ পর্যন্ত হইলো ।
– হ বাবা, তোমাগো আশীর্বাদে আর ঈশ্বরের কৃপায় পাইলাম চাকারিটা।
বাবা রিটায়ার্ড করেছে আজ পাঁচ বছর। রিটায়ার্ড করার আগের তিন বছর মধ্যপ্রাচ্যের চাকুরি বাদে জীবনের বেশীর ভাগ সময়ই বাবা বিদেশী জাহাজে চাকরি করেছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকলেও বাবার জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা প্রচুর। চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে বাবা বললো – নতুন চাকরিতে জয়েন করার আগ পর্যস্ত বর্তমানের চাকরিটা ঠিকমতন করিস। কাজে ফাঁকি দিস না।
– বাবা আমি কিন্তু আজ আধাবেলা ছুটি নিয়েই এসেছি। কাল সাপ্তাহিক ছুটি পরশু সকালে অফিস করবো।
– ঠিক আছে, আমি শুধু আজকের কথা কইনা, তোর বস খুব ভালোমানুষ, অনেক বছরতো চাকরি করলি,
তাই আমি কই ভাল মত বিদায় নিস, উনার মনে কোন কষ্ট দিস না।
– না বাবা, আমার নতুন চাকররি পাওয়ায় উনিও খুশী হয়েছেন, আমাকে দোয়া করেছেন।
রাত সাড়ে দশটায় খেতে বসে শিমুল। বাবাকে অনেক বলে কয়ে শুতে পাঠানো হয়েছে। মা আর জুঁই বসে আছে শিমুলের পাশে। খাওয়ার আয়োজন দেখে অবাক হয় শিমুল, কৈ মাছ ভাজা, নলা মাছের টক, ডাল আর বেগুন ভাজা।
– এত রাতে মাছ কোথায় পেলে মা?
– নলা মাছ আর ডাইল আমরা সকালেই রান্না করছি। কাইল বাজার থিকা তোর বাবা এক কুড়ি কৈ মাছ আনছিলো , দশটা আমরা খাইছি আর দশটা কোলায় জিলাইয়া রাখছিলাম। এখন শুধু কৈ মাছ আর বেগুন ভাজছি। তুই খা বাবা, ভাল কইরা খা, মেসে কি খাস না খাস।
তৃপ্তি সহকারে পেট পুরে খায় শিমুল – খুব মজা হইছে মা, আসলে তোমার হাতের রান্নার তুলনাই হয় না।
– হইছে, অনেক হইছে হাত ধুয়ে একটু দুধ খা। আর শোন, তোর বউ জুঁইও কিন্তু ভাল রান্না শিখছে।
জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে দুষ্টামির হাসি হেসে শিমুল বলে – তাই নাকি, তবে তোমার মত হবে না।
খাওয়ার পর্ব শেষ হলে শিমুল বলে – মা আমি একটু বাইরে থেকে আসছি।
– ঠিক আছে তাড়াতাড়ি আয় আর টর্চ নিয়া যা, বাইরে দড়ি টরি থাকতে পারে।
বাবা মার সামনে এখনও সিগারেট খায় না শিমুল, তাই বাইরে যেতে হচ্ছে। মা রাতে সাপকে দড়ি বলে, টর্চটা নিয়েই বেরোয় ও।
ঘরে ফিরে এলে মা বলে – তুই জুঁইকে নিয়ে দক্ষিণের ঘরে যা শিমুল। হারিকেনটা সারা রাইত জ্বালাইয়া রাখিস, রাইতে চোর ঘুরে ঘরের পাশ দিয়া।
দক্ষিণের এই ছোট টিনের ঘরটা বাবা মেরামত করে প্রায় নতুনের মত করে ফেলেছে শিমুলের বিয়ের আগে। সামান্য কিছু তৈজসপত্র দিয়ে ঘরটিকে বেশ সুন্দর পরিপাটি করে সাজিয়েছে জুঁই।
ঘরে ঢুকেই জুঁইকে বুকে টেনে নেয় শিমুল। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে জুঁই বলে – ছাড়তো, মশারীটা টাঙ্গাতে দাও।
– মশারী লাগবে না।
– লাগবে মিস্টার লাগবে, ভোররাতে মশারা যখন কানের কাছে কোরাস গাইবে আর মুখে হুল ফুটিয়ে সুখের ঘুম ভাঙ্গাবে তখন বুঝবে ঠ্যালা।
মশারী টাঙ্গাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে জুঁই। শিমুল চেয়ারে বসে সিগারেট ধরায়।
– তুমি আবার সিগারেট ধরাচ্ছ? এত সিগারেট খেয়ো না। তোমাকে না বলেছি সিগারেট ছেড়ে দিতে।
– ছাড়বো, যেদিন আমাদের বাবু হবে সেদিন ছাড়বো।
– শুধু অসভ্য অসভ্য কথা তোমার ।
– আচ্ছা জুঁই আমি যে নতুন চাকরি পেলাম তুমি খুশি হওনি?
– হয়েছি মানে, খুউব খুশী হয়েছি, আমার চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হয়নি।
– আমি ভেবেছি মেস ছেড়ে কারো সঙ্গে পার্টনারশিপে একটা রুম নেবো, তারপর তোমাকে নিয়ে যাবো মাঝে মাঝে, কি যে মজা হবে।
– এখনই এসব ভাবার দরকার নেই, আগে চাকরি শুরু কর, তারপর দেখা যাবে।
মশারী টাঙ্গীয়ে শিমুলের পাশে এসে দাঁড়ায় জুঁই। শিমুল ওর কাঁধে হাত রেখে বলে – জুঁই আমার ব্যাগটা এনেছ এ ঘরে?
– এনেছি। তুমি যখন সিগারেট খেতে বাইরে গিয়েছিলে মা তখন আমাকে বললো – জুঁই শিমুলের ব্যাগ, পানির মগ আর হারিকেনটা দক্ষিণের ঘরে রেখে এসো।
– ব্যাগটা কোথায় রেখেছো, আনতো।
ব্যাগ খুলে আনকোড়া একটা শাড়ী বের করে জুঁইয়ের হাতে দিয়ে শিমুল বলে – তোমার জন্য এনেছি।
সুন্দর শাড়ী দেখে জুঁইয়ের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে যায় – এত দামি শাড়ী এনেছ কেন?
– একটু দামী, তবে তোমার চেয়ে বেশি না। তোমার পছন্দ হয়েছেতো?
শিমুলের নাক টেনে দিয়ে জুঁই বলে – খুউব।
– তাহলে শাড়ীটা পড়ে এসোতো, দেখি তোমাকে কেমন মানায়?
– এখনই পরতে হবে, কাল সকালে পরলে হয় না?
– না, এখনই পরতে হবে।
– কিন্তু তোমার সামনেতো আমি পড়তে পারবো না , লজ্জা করবে।
– আমি অন্য দিকে তাকিয়ে থাকি?
– না তুমি বারান্দায় যাও, আমি ডাকলে আসবে।
জুঁইয়ের ডাক শুনে ঘরে এসে শিমুল দেখে জুঁই শাড়ী পরে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। শিমুল হারিকেনের সলতেটা বাড়িয়ে জুঁইয়ের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।
– কি দেখছো?
– তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।
– যা: আমি কি সুন্দর! আমিতো শ্যামলা।
– শ্যামলা বলেই তোমাকে এত সুন্দর লাগে, বেশি ফর্সা হলে এত ভাল লাগতো না।
– শাড়ীটা এখন খুলে ফেলি?
– কেন?
– এটাতো বাইরে পরার শাড়ী। এখন খুলে ভাঁজ করে রাখি, এরপর তুমি যখন আসবে, ওটা পরে তোমার সঙ্গে বেড়াতে যাবো।
– ঠিক আছে খুলতে পার, তবে এক শর্তে। শাড়ীটা পড়েছ তুমি, খুলবো আমি।
– কি বলছো তুমি পাগলের মত।
আঁচলে টান দিয়ে শিমুল বলে – একটু পাগলামী না করলেতো জীবনটা পানসে হয়ে যাবে ম্যাডাম।
রাত প্রায় একটা। শিমুল-জুঁই ঘুমায়নি তখনও। জুঁই ফিসফিস করে বলে – শুনতে পাচ্ছ কিছু?
– কি?
– ঘরের পূবপাশে কারা যেন এসে দাঁড়িয়েছে। অনেকগুলি পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে আর ফিসফিসানি। এ্যাই চোর নাতো?
শিমুল কিছুক্ষণ পেতে শুনে চিৎকার দেয় – এই কে? ক্যারা?
এরপর শোনা যায় কয়েক জোড়া পায়ের ধুপধাপ শব্দ। জুঁই জিজ্ঞেস করে – কারা এসেছিলো? চোর নাকি?
শিমুল হেসে বলে – চোর না, গ্রামের যুবক ছেলেরা।
– যুবকরা কেন এসেছিলো?
জুঁইয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে শিমুল বলে – তোমার আমার প্রেমলীলা দেখতে আর শুনতে।
– বল কি, কিন্তু কিভাবে দেখবে, সব জানালাতো বন্ধ।
– কেন ঘরের টিনের বেড়ার ছিদ্র দিয়ে।
– কি বদমাস ছেলেরা……!
– আরে ছেলেরা ওসব করেই, আমরাওতো করেছি।
– কি তুমিও করেছ এই নোংরামি! আসলে তুমি একটা মিনমিনে শয়তান।
পরদিন সকালে জুঁইয়ের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে শিমুলের – এই যে মিস্টার উঠেন, আপনার চা রেডি।
– তুমি কখন উঠেছ?
– সেই কখন। মেয়েদের কি সে ভাগ্য আছে যে সকাল আটটা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকবে, কত কাজ বাড়িতে।
চা খেতে বসে শিমুল দেখে আয়োজন ভালই – গরম গরম চিতই পিঠা সঙ্গে পাতলা ডাল, হাফ বয়েল ডিম সঙ্গে মুড়ি আর ঘন গরুর দুধের চা। মা বলে – আমাদের খইয়া রঙ্গের মুরগীটা গত পরশু থেকে ডিম পারতাছে। তুই মুড়ি দিয়ে ডিম খাইতে ভালবাসছ , খা বাবা দুইটা ডিম খা।
চিতই পিঠায় একটা কামড় দিয়ে শিমুল বলে – আমার জানামতে ঘরেতো চালের গুড়ি ছিলোনা, পিঠা বানালে কেমনে মা?
বাবা হেসে বললো – জানস শিমুল, কাইল রাইত ভইরা তোর মা পাটায় চাল বাইটা গুড়ি করছে।
মার দিকে তাকিয়ে শাসনের সুরে শিমুল বললো – কাজটা কিন্তু মোটেও ভাল কর নাই মা, তোমার বয়স হইছে।
গ্রামের পশ্চিম পাড়ায় বিয়ে হয়েছে শিমুলের ছোট বোন বেলির। বেলির স্বামী রবীন মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি করে। অনেক টাকা ওদের। দাদা এসেছে শুনে দামি শাড়ী আর ভারি গয়না পরে দাদার সঙ্গে দেখা করতে আসে বেলী।
বোনকে দেখে শিমুল বলে – আমার পাশে বস বেলী, চা খা। তুই ভাল আসিছতো, রবীনের খবর কি?
– ভাল আছি দাদা। সে-ও ভাল আছে, কাইল চিঠি পাইছি।
– তোর জন্য একটা গল্পের বই আনছি।
– কি বই দাদা?
– নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেমসাহেব ’। গল্পের বই বেলীর খুব প্রিয়। ওর সময় কাটে বই পড়ে আর স্বামীকে চিঠি লিখে।
চায়ের পর্ব শেষ হলে বেলীকে ঘরে নিয়ে বসায় জুঁই – তোমার শরীর ভালতো বেলিদি? সম্পর্কে ননদ হলেও বয়সে বড় বলে বেলীকে দিদি বলে ডাকে জুঁই। বেলী পাঁচ মাসের অন্ত:স্বত্তা।
– ভালই। আগামী সপ্তায় বান্দুরা যামু ডাক্তারের কাছে।
– শরীরের যত্ন নিও দিদি।
জুঁইয়ের চিবুক স্পর্শ করে বেলী বলে – তুমি খুব ভাগ্যবতী বৌদি, আমার দাদার মতন একজন স্বামী পাইছো।
– তুমি কি কম ভাগ্যবতী দিদি, কত বড়লোক তোমরা, রবীনদাওতো অনেক ভালমানুষ।
– আর ভালমানুষ, তারেতো কাছে পাই দুই বছর পর পর।
পৌনে বারটায় ভাত খেতে বসে শিমুল। বাড়ির মুরগীর মাংসের তরকারী, টাটকিনি মাছ ভাজা আর মুলা শাক।
খাওয়া শেষ হলে মা বলে – দক্ষিণের ঘরে গিয়া একটু বিশ্রাম কর শিমুল। জুঁই তুমিও যাও, ওর ব্যাগটা গুছাইয়া দাও।
ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দেয় শিমুল। জুঁই বলে – কি করছো তুমি, বাবা-মা কি ভাববে বলতো।
– কিচ্ছু ভাববে না, দেখলেনা মা-ই আমাদের সুযোগ করে দিলো।
কিছুক্ষণ পর শিমুল বলে – এবার আমার কি হয়েছে বলতো, তোমাকে ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছে, খুব।
জুঁইয়ের চোখে জল এসে যায় – এভাবে বোলোনা তুমি।
আরও কিছুক্ষণ পর বাবার কন্ঠ শোনা যায় – বাবা শিমুল, ধলা মাঝি চইলা আসছে অনেকক্ষণ, এখনই বাইর না হইলে লঞ্চ ফেল করবি।