অন্য এক দুনিয়া 

ভ্যালেন্তিনা অপর্ণা গমেজ  ঘড়িতে তখন রাত তিনটা বাজে। সবাই অঘোরে ঘুমোচ্ছে। চালের উপর টুপটাপ শিশিরের জল পরছে। সারারাত ঘেউ ঘেউ ডেকে শেষ প্রহরে এসে কুকুরটাও ক্লান্ত হয়ে বারান্দার কোনে শুয়ে আছে ,তার চোখেও ঘুম লাগছে। ঠিক সময়ে ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে বাজলেও গভীর ঘুমের রাজ্যে কেউ যখন হাটে তা শুনতে পায়না। করবী দেখল এমন […]

ভ্যালেন্তিনা অপর্ণা গমেজ 

ঘড়িতে তখন রাত তিনটা বাজে। সবাই অঘোরে ঘুমোচ্ছে। চালের উপর টুপটাপ শিশিরের জল পরছে। সারারাত ঘেউ ঘেউ ডেকে শেষ প্রহরে এসে কুকুরটাও ক্লান্ত হয়ে বারান্দার কোনে শুয়ে আছে ,তার চোখেও ঘুম লাগছে। ঠিক সময়ে ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে বাজলেও গভীর ঘুমের রাজ্যে কেউ যখন হাটে তা শুনতে পায়না। করবী দেখল এমন একটা জায়গায় সে হাঁটছে যেখানে সব অচেনা মানুষ। সবাই প্রচন্ড ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণায় কাতরাচ্ছে এক ফোটা জল নেই। করবী নিজেও খুব তৃষ্ণার্ত । 

এদিক ওদিক খুঁজছে এক ফোটা জল কোথাও নেই । হাঁটতে হাঁটতে সে দেখতে পেল দুরে একটা আলো ঝলমলে প্রাসাদ, তার চারপাশে আর কিছু নেই। প্রচন্ড ক্ষুধা-তৃষ্ণায় সে ছুটে গেল যদি কিছু  মেলে।কাছে এগিয়ে যেতেই দেখতে পেল 

প্রাসাদের চারপাশে কাঁটা তারের বেড়া,কোনভাবেই যেন ভেতরে ঢোকা যাবে না। উঁকিঝুঁকি মারতেই বড় কাঁচের জানালা দিয়ে খাবার ঘরটি দেখা যাচ্ছে। টেবিলে বাহারি খাবার ফলমূল,মিষ্টি, দই। তার জিভে জল এসে গেল। সে দেখল  একটা মেয়ে খুব সুন্দর পোশাক পড়ে খাবার টেবিলের কাছে এলো। তার চারপাশে দাস-দাসীও আছে। মেয়েটা জানালার কাছে আসতেই করবী চিনতে পারল তাকে। এতো সেই মেয়ে যে কিনা করবীর বাসায় বুয়ার  কাজ করে। করবী খুশিতে হাত উঁচু করে তাকে ডাকলো। 

মর্জিনা, এই মর্জিনা এদিকে তাকা,এই যে আমি তোর দিদি। কিরে চিনতে পারছিস না? 

মেয়েটা কাঁচের জানলার ভেতরে কিছুই শুনতে পেলনা। করবী আরো চিৎকার করে বলল আমি তোর দিদি মনি, দরজাটা খোল একটু জলখাবার দে। ক্ষুধা তৃষ্ণায় মরে যাচ্ছি আর গরমে শরীরটাও পুড়ে যাচ্ছে। 

করবী গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক জোরে জোরে  মর্জিনা মর্জিনা বলে ডাকছে। একটা সময় করবীর বর শুনতে পেল করবী ঘুমের মধ্যে খুব গোঙরাচ্ছে। তখন তাকে জাগানোর চেষ্টা করল। কোনোভাবেই ঘুমটা ভাঙছে না দেখে তার পিঠে ঝাকুনি দিতেই করবী উঠে বসলো। সে খুব ঘামছিল। করবীর বর জিজ্ঞেস করল –

কি হয়েছে করবি স্বপ্ন দেখেছ?

করবী চোখ মেলে চারপাশটা দেখে মনে হলো আসলেই তো সে স্বপ্ন দেখেছে। আঁচল টেনে মুখ মুছল।কি হয়েছে কি স্বপ্ন দেখেছো বারবার মর্জিনার নাম ধরে  গোঙরাচ্ছিলে কেন? 

দেবেশ প্রশ্নগুলো করতে করতে তাকে জল ঢেলে দিল। করবী এমনভাবে জল পান করল, যেন কত দিন ধরে জলপান করেনি করবী।করবী তখনো ঘামছিল। দেবেশ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বল্লো এখনো বেশ রাত আছে শুয়ে পড় সকালেই না হয় শুনব।দেবেশ লাইট বন্ধ করে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো সে ভাবতে লাগল এমন স্বপ্ন দেখার কি কারন? এতো যেমন-তেমন স্বপ্ন ছিল না? 

সবকিছু অন্যরকম,যেন মৃত্যুর ওপারে। সবাই হাহাকার করছিল এক ফোঁটা জলের জন্য।সে নিজেও কাতরাচ্ছিল অথচ তার বাড়ির কাজের লোকের কাছে এমন করে মিনতি করলো শুধু এক ফোটা জলের জন্য।স্বপ্নটার অর্থ খুঁজতে খুঁজতে তার আর ঘুম হল না। সূর্য উঠতেই সে জানালা খুলে বারান্দায় দাঁড়াল। বার বার চোখের সামনে ওই দৃশ্যটাই ভাসতে লাগল।সাতটা বাজতেই  মর্জিনা দরজায় নক করল। দরজা খুলে করবী যেন নতুন করে মর্জিনাকে দেখতে লাগল। মর্জিনা তার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। রোজ মর্জিনাকে ধমকাতো একটু দেরি হলেই। আজ করবী কোন কথাই বলল না। মর্জিনা ওর ছোট মেয়েটাকেও সাথে করে নিয়ে আসে তা নিয়েও করবী খ্যাচ খ্যাচ করে।একদিন মেয়েটার হাত ফসকে একটা কাপ ভেঙেছে তা নিয়ে করবী খুব চেঁচামেচি করেছে। মর্জিনার তো কোন উপায় নেই কষ্ট পেলেও পেটের দায়ে সবই হজম করে নিতে হয়। করবী আজ ছোট মেয়েটাকে কাছে ডাকল। 

শাহানা এদিকে আয় তো।

মর্জিনার পাশে বসে একটা পুরনো মাটির পুতুল নিয়ে খেলছিল। মর্জিনা তাকিয়ে মেয়েকে ইশারা দিল কাছে যেতে। মেয়েটা ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেল। আরে ভয় পাচ্ছিস কেন? 

তোকে কিছু দেব আয়। ফ্রিজ থেকে একটা আপেল বের করে শাহানার হাতে দিলো। শাহানা খুশিতে সেটা হাতে নিয়েই তার মায়ের কাছে গেল। মর্জিনা অবাক হয়ে গেল। আজ একদম অন্যরকম ব্যবহার যা আগে কখনো সে দেখেনি। করবীর বর চায়ের টেবিলে খবরের কাগজ নিয়ে বসেছে কিন্তু দৃষ্টি করবীর দিকে। কাজে যাবার তাড়া ছিল বিধায় তৎক্ষণাৎ কারনটা জানতে পারল না। করবীকে কিছুটা উদাস মনে হচ্ছে সেটাও তার বর লক্ষ্য করেছে। রোজকার মতো গলার স্বরটাও হাইপার না তবে বিষয়টা স্বাভাবিক নয়।

করবী বরের জন্য আর ছোট মেয়ে রোদেলার টিফিন প্যাক করে দিল। রোদেলা শাহানার হাতে আপেল দেখে মা কে প্রশ্ন করল ও মা দেখেছে শাহানা আপেল নিয়েছে? 

স্কুলে যাও দেরী হয়ে যাচ্ছে।

মেয়ের প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে তাদের দুজনকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। আজ এমন একটা দিন শুরু হয়েছে সবার মনেই তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। মর্জিনা সকালে কাজে আসে দুপুরে চলে যায়।আবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আরো দুটো ঘরে কাজ করে। একেকটা বাড়িতে কাজ হিসেবে তার টাকা নির্ধারিত। যেহেতু মর্জিনার  স্বামী অসুস্থ তেমন কাজকর্ম করতে পারেনা তাই ছোট মেয়েকে সাথে করেই কাজে বের হয়। করবী রান্নাঘরে সবজি কেটে গ্যাস চালু করে কড়াইটা বসিয়ে দিল। রান্না ঘরের এক কোণে বসে শাহানা আপন-মনে খেলে রোজ। মর্জিনা ব্যস্ত থাকে তার কাজে। করবী রান্নার ফাঁকে ফাঁকে কথা বলেছে শাহানার সাথে। মর্জিনা মেয়ের জন্য মাঝে মাঝেই কথা শোনে, নালিশ হজম করে। তবে শাহানা খুব শান্ত মেয়ে। করবী চুলার আঁচ কমিয়ে বেডরুমে গেল। মেয়ের পড়ার টেবিল থেকে একটা পেন্সিল, রাবার আর খাতা এনে শাহানাকে দিল। আজ থেকে লেখা শিখবি। আমি দেখি তুই রোজ খেলনা দিয়ে খেলিস। লেখাপড়া না শিখে বোকা হয়ে থাকতে চাস?

মর্জিনা কথাটা শুনে জবাব দিল 

ওরে ইস্কুলে দিতে চাই দিদি কিন্তু মাস গেলে হাতে আর কিছু থাকে না। ওর বাপের ওষুধেই অর্ধেক টাকা চলে যায়। করবী জানতে চাইলো মাসিক বেতন কত দিতে হয় স্কুলে? 

আমার ভাইস্তীর কাছে শুনছি বেতন খুব বেশি না কিন্তু বইখাতা এসবেই অনেক খরচ। তবে খুব বেশী না হলেও আমার পক্ষে তো মুশকিল। করবী মর্জিনাকে আশ্বস্ত করে বললো ওর বইখাতা যা লাগে আমি কিনে দেবো তুই ওকে স্কুলে ভর্তি করা। নিজে তো পড়ালেখা করতে পারিস নি অন্তত মেয়েটাকে পড়া। মর্জিনা মেয়েকে বলল মারে খালামনির পা ধরে সালাম কর। শাহানা তাই করল দৌড়ে গিয়ে করবীর পা ধরে সালাম করল। 

আরে কি করছিস সালাম কর

তে হবে না। এখন থেকে তুই স্কুলে যাবি মনে থাকবে? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মর্জিনা কাজ শেষ করতে ব্যস্ত হল। 

করবিও রান্না শেষ করে থালা-বাসন 

সিংকে রেখে ফ্যান ছেড়ে চেয়ারে বসলো। করবীর পায়ে মাঝে মাঝে ব্যাথা হয় অনেক লম্বা সময় সে দাঁড়িয়ে কাজ করতে পারেনা। 

মর্জিনা সব কাজ শেষ করে যখন বের হবে করবী তার পার্স থেকে  টাকা বের করে মর্জিনার হাতে গুঁজে দিল। তার কাঁধে হাত রেখে বলল মেয়েকে খাতা পেন্সিল কিনে দিস আর ওকে অবশ্যই স্কুলে ভর্তি করে দিস। 

মর্জিনা খুশিতে কেঁদেই ফেলল। এতদিন ধরে এ ঘরে সে কাজ করছে কিন্তু করবীকে এমন দরদী স্বভাবে এ প্রথম অনুভব করা। এক রাতে এমন কি ঘটলো যে সকালে পুরো মানুষটাকেই বদলে দিল। মর্জিনা চলে গেল ঠিকই  তবে তার অবাক নয়নে একটা প্রশ্ন থেকে গেল। করবী হাতের বাকি কাজগুলো সেরে স্নান করে তার বরের জন্য আর মেয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলো। টিভিতে গানের সো ছেড়ে সোফাতে  পা মেলে বসলো। সারাদিন পর ফোনে চোখ বুলাতেই তার চোখে পড়ল বান্ধবীর বরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর ছবি পোস্ট করেছে। মাত্র দু’বছর তাদের বিবাহিত জীবন একটা কার অ্যাক্সিডেন্টে সব তছনছ করে দিল। তাদের ঘরে ফুটফুটে কন্যা,কিছু বোঝার আগেই বাবার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেল। তার আজ মনে হতে লাগলো জীবনটা সত্যিই কতো ছোট অথচ কেউ কেউ কতো গভীর বেদনা,গভীর একাকিত্ব নিয়ে বাঁচে। করবীর ভাষা নেই তার সহপাঠীর মনকে শান্ত করার। আদৌও আছে কি কোন সান্ত্বনা?

ধুপ ধাপ পায়ের শব্দ শুনতেই করবী বুঝতে পারল মেয়ে স্কুল থেকে ফিরছে। ফোনটা রেখে এগিয়ে বারান্দায় গেল। দেবেশের হাত ধরে হেলতে দুলতে ঘরে প্রবেশ করল। রোজকার মতন করবী দেবেশকে স্নানে যেতে বলল। স্কুল ব্যাগটা রেখে মেয়ে টিভির রিমোট হাতে নিতেই করবী বলে উঠলো আগে স্নান, খাওয়া, হোমওয়ার্ক তারপর টিভি।মেয়ে মুখটা গোমড়া করে রিমোট রেখে তার রুমে চলে গেল। দেবেশ সোফায় বসে করবীর দিকে তাকাল। চোখে তাকে ইশারা করলো পাশে বসতে। তারপর করবীর হাতটা নিজের হাতের তালুতে রেখে জানতে চাইল কাল রাতে কি স্বপ্ন দেখেছ?

বারবার তুমি মর্জিনার নাম ধরে গোঙরাচ্ছিলে।

করবী বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। আমি যে কেন এমন স্বপ্ন দেখলাম পুরো দিন সেটাই ভাবলাম। 

এবার বল কি দেখলে?

দেখলাম আমি যেন একটা অন্যরকম দুনিয়াতে গেছি, সেখানে আমার চারপাশে সব অদ্ভুত মানুষ। তাদের চেহারা কারো কারো খুব বিকৃত সবাই হাহাকার করছে। চারপাশে আগুন সবাই তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত। আমারও প্রচন্ড পিপাসা পেয়েছে। পিপাসায়  কাতর হয়ে পড়েছি। আমি হাঁটতে হাটঁতে  অনেক দূরে দেখলাম একটা প্রাসাদ। 

আমি ছুটে গেলাম মনে মনে ভাবলাম নিশ্চয়ই ওখানে একটু জল তো মিলবেই। কাছে যেতেই দেখি তার চারপাশে কাঁটা তারের বেড়া কোনভাবেই ভেতরে ঢুকতে পারবে না কেউ। আমি প্রাসাদের চারপাশে হাঁটতেই একটা বড় কাঁচের জানালা চোখে পড়লো। ভালো করে ভেতরে নজর দিতেই দেখলাম মর্জিনা একদম রাজকন্যার মত দামী পোশাকে খাবার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে। ওর চারপাশে অনেক দাস-দাসী। টেবিলে এতো এতো খাবার আর পানীয়।

আমি মর্জিনাকে এত ডাকছি,  মিনতি করছি আমাকে একটু জল দে, আমি তোর দিদি। কিন্তু মর্জিনা কিছুতেই শুনছে না। আমি চিৎকার করেই যাচ্ছি ঘুমটা তুমি ভাঙালে অবশেষে। 

তুমি প্রচন্ড ঘামছিলে। আমি তোমাকে জল এমন করে কখনো পান করতে দেখিনি। মনে হলো কতদিন জল খাওনি। পুরো দুই গ্লাস জল তুমি পান করেছ। 

সত্যিই আমি অন্যে এক দুনিয়াতে ছিলাম। আহারে কেমন সে পিপাসা, কি যে কষ্ট। 

যাক স্বপ্ন তো স্বপ্নই তার ব্যাখ্যা আমারও জানা নেই।  তবে আমরা সুন্দর জীবন যাপন করবো,মৃত্যুর ওপারে তার অবশ্যই ভালো উপহার গ্রহনের যোগ্যতা থাকবে। এনিয়ে আলাদা করে ভাবার দরকার নেই। ভালো কিছু করো, ভালো কিছু ভাবো, সব কিছু ভালোই হবে।