বিশ্বকাপের শহর ভ্যানকুভার
ফুটবল বিশ্বকাপের সঙ্গে আমার পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। বাংলাদেশে বড় হওয়া আমিও রাত জেগে বিশ্বকাপ দেখেছি, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক করেছি, প্রিয় দলের জয়-পরাজয়ে আনন্দে ভেসেছি কিংবা মন খারাপ করেছি। কিন্তু কখনো ভাবিনি, একদিন ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক শহরেই বাস করব, আর স্টেডিয়ামে বসে সরাসরি বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার সৌভাগ্য হবে।
গত ছয় বছর ধরে আমার ঠিকানা কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার অপরূপ শহর ভ্যানকুভার। এই শহরকে আমি আমার ঠিকানাই বলি না, আজ এই শহর আমার পরিচয়ের অংশ। আর ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ যেন সেই শহরকে নতুন এক পরিচয়ে পরিচিত করিয়ে দিল একটি বিশ্বমঞ্চ হিসেবে।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার অনেক আগ থেকেই ভ্যানকুভার যেন ফুটবল উৎসবের শহরে পরিণত হয়েছিল । শহরের রাস্তাঘাট, পার্ক, ট্রানজিট স্টেশন, ডাউনটাউন সবখানেই বিশ্বকাপের রঙে রঙিন। প্রতিটি ম্যাচ ডে ছিল আলাদা উত্তেজনায় ভরা। সকাল থেকেই মানুষের মুখে ফুটবলের আলোচনা, রাস্তায় বিভিন্ন দেশের জার্সি, ক্যাফে ও রেস্টুরেন্টে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস পুরো শহর যেন এক বিশাল ফুটবল পরিবারের রূপ নিয়েছিল।
সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ছিল সায়েন্স ওয়ার্ল্ড। সাধারণত গোলাকার এই স্থাপনাটি রাতে আলোকসজ্জায় ফুটে ওঠে, কিন্তু বিশ্বকাপ উপলক্ষে এটিকে এবারের অফিসিয়াল ফুটবলের আদলে সাজানো হয়েছিল। দূর থেকে মনে হচ্ছিল যেন শহরের মাঝখানে একটি বিশাল বিশ্বকাপের ফুটবল সবাইকে এই শহরে স্বাগতম জানাচ্ছে। আরেকটি দৃশ্য আজীবন মনে থাকবে।ভ্যানকুভারের প্রতীক গ্রাউস মাউন্টেন যেটি শহরের প্রায় প্রতিটি কোণ থেকেই দেখা যায়—তার গায়ে স্থাপন করা হয়েছিল বিশাল এক কানাডিয়ান পতাকা। পাহাড়, পতাকা আর নীল আকাশ মিলিয়ে দৃশ্যটি যেন পুরো শহরের গর্ব ও অতিথিপরায়ণতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
আরো একটি মজার ব্যাপার হলো হকি প্রিয় কানাডিয়ানরা নতুন করে ফুটবলের প্রেমে পড়েছে এবারের বিশ্বকাপে। কানাডিয়ানরা হকি ছাড়া অন্য খেলাকে খুব বিশেষ একটা গুরুত্ব দেয় না। এবারের বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশ হিসেবে অংশগ্রহণ এবং অসম্ভব সুন্দরভাবে উজ্জাপন করেছে ফুটবলকে। বিশেষত, এবারই কানাডা বিশ্বকাপে প্রথম কোনো ম্যাচ জিতেছে এবং রাউন্ড অফ ১৬ পর্যন্ত উর্তীর্ণ হয়েছে। নিঃসন্দেহে সেরা পারফর্মেন্স। তাই বলাই যায় যে কানাডাতে ফুটবল খেলার একটা জাগরণ শুরু হয়ে গেলো এবারের বিশ্বকাপের মধ্য দিয়ে।

এই উৎসবের মধ্যেই আমি জীবনের প্রথম ফিফা বিশ্বকাপের ম্যাচ স্টেডিয়ামে বসে দেখার সুযোগ পাই কানাডা বনাম সুইজারল্যান্ড। স্টেডিয়ামে প্রবেশের মুহূর্ত থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, এটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়; এটি বিশ্বের নানা ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের এক মহামিলন। হাজার হাজার দর্শকের একসঙ্গে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া, প্রতিটি আক্রমণে গর্জে ওঠা, গোল হলে স্টেডিয়াম ভর্তি মানুষের বাঁধ ভাঙা উচ্ছাস এসব অনুভূতি টেলিভিশনের পর্দায় কখনোই পুরোপুরি ধরা পড়ে না। ম্যাচের ফলাফল একদিন ভুলে যেতে পারি, কিন্তু সেই পরিবেশ, সেই আবেগ আর সেই মুহূর্তগুলো চিরকাল মনে থাকবে ।
ভ্যানকুভারের কথা বলতে গেলে শুধু বিশ্বকাপের গল্প বললে অন্যায় হবে। প্রকৃতি যেন এই শহরকে দু’হাত ভরে আশীর্বাদ করেছে। একদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশি, অন্যদিকে বরফঢাকা পাহাড়। সকালে সমুদ্রের ধারে হাঁটা, বিকেলে পাহাড়ে হাইকিং, আবার শীতকালে স্কিইং সবই একই শহরে সম্ভব। স্ট্যানলি পার্ক, ইংলিশ বে, কিটসিলানো বিচ, ক্যাপিলানো নদী, কিংবা উত্তর তীরের পাহাড় প্রতিটি জায়গাই যেন প্রকৃতির একেকটি শিল্পকর্ম।

এখানকার আবহাওয়াও কানাডার অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় অনেকটাই মৃদু। শীত তুলনামূলক সহনীয়, গ্রীষ্ম আরামদায়ক, আর বছরের বড় একটি সময় মানুষকে বাইরে সময় কাটাতে উৎসাহিত করে। তাই এখানে সাইকেল চালানো, দৌড়ানো, কায়াকিং, ট্রেইল রানিং কিংবা পাহাড়ে হাঁটা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
আরেকটি বিষয় আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে এই শহরের মানুষ। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ এখানে একসঙ্গে বাস করে। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন বিশ্বাস সবকিছুর মাঝেও পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থানের যে সংস্কৃতি এখানে গড়ে উঠেছে, তা সত্যিই অনুকরণীয়। বিশ্বকাপের সময় সেটি আরও স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছে। সবাই নিজ নিজ দলকে সমর্থন করেছে, কিন্তু উৎসব ছিল সবার।

ছয় বছর আগে আমি বাংলাদেশের ঢাকা থেকে ভ্যানকুভারে এসেছিলাম নতুন স্বপ্ন নিয়ে। তখন এই শহর ছিল একেবারেই অচেনা। ধীরে ধীরে এর পাহাড়, সমুদ্র, বৃষ্টি, মানুষ আর জীবনযাত্রার সঙ্গে আমার এক অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আজ যখন বিশ্বকাপের মতো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব এই শহরে অনুষ্ঠিত হয়, তখন মনে হয় আমি সত্যিই ভাগ্যবান। বাংলাদেশে বসে ছোটবেলায় যে বিশ্বকাপ দেখতাম, আজ সেই বিশ্বকাপের অংশ হতে পেরেছি এটি নিঃসন্দেহে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এবারের বিশ্বকাপ প্রায় শেষের পথে। শহরের সাজসজ্জা খুলে যাবে, দর্শকদের ভিড় কমে আসবে। কিন্তু এই সময়ের স্মৃতি, এই শহরের প্রাণচাঞ্চল্য, ফুটবল উৎসব, সবার মনে বাঁধ ভাঙা আনন্দের অনুভূতি অনেকদিন হৃদয়ে রয়ে যাবে।
হয়তো বহু বছর পরও যখন কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করবে, “বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি কী?”—আমি শুধু ম্যাচের কথা বলব না। বলব সেই শহরের কথা, যে শহর কয়েক সপ্তাহের জন্য পুরো পৃথিবীকে নিজের কাছে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আর গর্বের সঙ্গে বলব, সেই শহরটির নাম ভ্যানকুভার।