একটি চমৎকার বাড়ি
তিন রাস্তার মোড় থেকে ডানে গেলেই সোজা যে বাড়িটি দেখা যায়, তার প্রধান ফটকে লেখা আছে, ‘একটি চমৎকার বাড়ি’। ঠিক তার নিচে লেখা, ‘মানুষ হইতে সাবধান’, ‘পাখিদের ভালোবাসুন’-এর পাশে লেখা, ‘বা…ল’ বা এবং ল-এর মাঝের অক্ষরটি মনে হচ্ছে কেউ কোদাল দিয়ে শিকড়সহ উঠিয়ে ফেলেছে।
প্রধান ফটকে কড়া নাড়লেই একজন বৃদ্ধ লোক কাশতে কাশতে খুলে দেবে। সে যেকোনো মানুষকে দেখলেই মুখ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে; যেন সে এই প্রথম কোনো মানুষ দেখল। কিছু দূর এগোতে দেখতে পাওয়া যাবে একজন বদ্ধ পাগলকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। পাগলটা লোকজন দেখলেই বলে ওঠে, ‘মর মর, কত খাবি!’
পাগলের খুঁটির ঠিক পেছনেই সুসজ্জিত একটি বাগান, যেখানে ফুল ও ফলের গাছ রয়েছে। সারা বছরই কোনো না কোনো ফুল দেখা যায়। সেই জন্যই বোধ হয় বাগানের যৌবনে ভাটা পড়ে না। মিষ্টি ফুলের গন্ধ গলগল করে নাকে ঢুকে পড়ে। আচ্ছন্ন করে রাখে, এক আশ্চর্য মায়ায়। মাঝেমধ্যে প্রজাপতির ওড়াউড়ি দেখা যায়, তবে দুতলা বিল্ডিংয়ের লাগোয়া একটি বিশাল আমগাছ আছে। সেখানে প্রতি বিকেলে বিভিন্ন ধরনের পাখি এসে বসে। হয়তো তারা সুখ-দুঃখের গল্প করে। পৃথিবী নিয়ে আশা-হতাশার গল্প করে করে সময় অতিবাহিত করে, সন্ধ্যা হতে না হতেই ফুড়ুৎ করে উড়ে যায় নিজ নিজ গন্তব্যে।
বিল্ডিংয়ের পেছনের দিকে কয়েকটা মোটা মোটা কড়ইগাছ। ঠিক দুপুরবেলায় গাছগুলোকে কেমন যেন মরা মরা লাগে। মনে হয় ভিটামিনের অভাবে তারা শুকিয়ে গেছে। তবে বিকেল হতেই সতেজ হয়ে ওঠে। এমনটি হওয়ার কারণ এখনো বুঝতে পারা যাচ্ছে না। ডান দিকে তেমন কিছু নেই, দেয়ালের ওপাশ দিয়েই মূল রাস্তা বাঁক নিয়ে চলে গেছে শহরের দিকে। বাঁয়ে রয়েছে বিশাল ঘাট-বাঁধানো একটি পুকুর। স্বচ্ছ পানি। তাকালেই নিজের ছবি সেখানে ভেসে উঠবে। আয়নার বদলে আদিম মানুষ প্রথমে পানিতেই নিজের মুখ দেখে আতঙ্কিত হয়েছিল। এখন আর কেউ আতঙ্কিত হয় না। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজের মুখ দেখে হয়তো কেউ হয় হতাশ, কেউবা আনন্দিত। যত দূর মনে হয় বেশির ভাগ মানুষই হতাশ; সে যতই সুশ্রী হোক না কেন। পুকুরের চার ধারে রয়েছে হরেক রকম গাছ। ঘাট দিয়ে নামার সময় ডান দিকেই একটি জামগাছ। যখন গাছের জাম পেকে যায়, তখন জাম নিচে পড়ে পাকা সিঁড়িগুলোকে রাঙিয়ে দেয়। অপর পাশে রয়েছে তিনটি কদমগাছ। অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায় যখন কদমগাছে ফুল আসে। সিঁড়ি থেকে সোজা তাকালেই দেখা যায় ওপারের গাছগুলো। চার ধারের গাছগুলো পুকুরকে এক্কেবারে ঢেকে রেখেছে। একটি ঘরের মতো। সাঁতরে সাঁতরে পুকুরের মাঝখানে গিয়ে আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় কোনো এক আশ্চর্য জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে।
বিল্ডিংটা গোলাপি রঙের। গেটের দুই দিকে দুটি মূর্তি। মূর্তিগুলো উলঙ্গ নারীর। খুবই দামি মূর্তি শোনা যায়। তবে নারীর উলঙ্গ মূর্তি দেখে এলাকার মুরব্বিগোছের এক লোক একদিন বলেছিলেন, ছি ছি, ন্যাংটা মহিলাকে এইভাবে কেউ রাখে? আপনাদের কি লজ্জা-শরম নেই? তবে বলাই সার। অবশ্য শেষ পর্যন্ত মূর্তি দুটি সরানোর প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি।
মূর্তি দুটি রেখে ভেতরে পা দিলেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে ওপরতলার রুমগুলো। দরজাগুলো কারুকার্য করা। প্রতিটি দরজার সামনে বারান্দা। বারান্দায় রকিং চেয়ার। নিচের রুম খেয়াল করলে অনেকগুলো পেইন্টিং নজরে আসে। সেখানে পৃথিবী বিখ্যাত মোনালিসার ছবিটি শোভা পাচ্ছে। ঠিক তার উল্টো পাশেই নগ্ন নর-নারীর চিত্র। কে এঁকেছে কেউ জানে না। এই বাড়ির বর্তমান মালিক নাছির-উল্লাহ বলেন, এই চিত্রকর্মটি আমার দাদার দাদার। তিনি একজন বিখ্যাত চিত্রক ছিলেন। তাঁর নাম হাফিজুর রহমান।
দ্বিতীয় তলায় অনেকগুলো থাকার ঘর। সেখানে বাড়ির তিন ছেলে ও এক মেয়ে তাদের নিজ নিজ কক্ষে থাকত। নাছির-উল্লাহর স্ত্রী বহুদিন আগেই গত হয়েছেন। তাই তিনি একাই বসবাস করেন। তাঁর ছেলেমেয়েদের ঘর বলতে গেলে খালিই পড়ে আছে। প্রতিটা রুমেই এসি আছে। নীল রঙের দেয়াল। যার যা আসবাব দরকার, তার সবটাই রয়েছে।
দ্বিতীয় তলায় উঠে বাঁ দিকে হাঁটলেই একটি সিঁড়ি চোখে পড়ে। হাঁটতে হাঁটতে সেই সিঁড়ির সামনে গেলে বোঝা যায়, হ্যাঁ এটাই ছাদে ওঠার পথ। সিঁড়িতে থাকা অবস্থায় বিশাল এক দেবদারুগাছের মাথা দেখা যায়। সেই মাথাটুকু দেখলে মনে হয় গোলাপ ফুল। রং যদি একই রকম হতো, তাহলে সবাই ভাবত এত বড় গোলাপ কোথা থেকে এল?
ছাদে উঠতেই চোখে পড়বে চারপাশের গাছ। ছাদে কিছু ফুলের গাছ আছে । যেগুলো নাছির-উল্লাহ নিজ হাতে লাগিয়েছেন। সেখানে প্রজাপতি থাকবেই। খেয়াল করলে দেখা যাবে কোনো না কোনো গাছে ফুল আছে। বিশেষত দুপুরে ছাদে উঠলে দুপুর্যা নামে একধরনের ফুল দেখা যায়, যেগুলো দুপুরেই ফোটে। দেখে যে–কেউই মুগ্ধ হবে। আরেকটি কথা, পায়ের নিচে দেখতে পাবেন হালকা সবুজাভ শেওলা, যা ছাদের সৌন্দর্যকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কিছুক্ষণ যাবৎ একটা শব্দ হচ্ছিল। এত সুন্দর একটা বাড়ি দেখতে এসে এসব শব্দ সহ্য করা দুরূহ। কিন্তু সেই শব্দ যদি আসে আকাশ থেকে, সহ্য না করে উপায় থাকে না। এতক্ষণ শব্দটা মৃদু ছিল, তবে ক্রমে বেড়েই চলেছে। গাছ থেকে একটা ফুল ছেঁড়ার সঙ্গে সঙ্গে শব্দ আরও বেড়ে গেল।
চোখের সম্পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়েও কিছু দেখা গেল না। হয়তো অন্য কোথাও থেকে শব্দ আসছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা ছোট্ট বিমান চোখে ধরা পড়ল। এই ছোট্ট বিমানের যে এতটা শব্দ হবে, তা বুঝতে পারিনি। না বোঝারই কথা।
আরও কিছুক্ষণ ছাদে হাঁটাহাঁটি করে নিচে নামাই শ্রেয় ভেবে নিচের দিকে পা বাড়ালাম। কয়েক ধাপ সিঁড়ি পার হতেই শব্দটা এত বিকট হলো যে কানে কিছুই শুনতে পাচ্ছিলাম না। দ্রুত সেই বাড়ি থেকে বের হয়ে এলাম। ধীরে ধীরে যতই দূরে যাচ্ছি, বাড়িটা নিয়ে ততই কল্পনায় বিভোর হচ্ছি। আর শব্দটা কান ধাঁধিয়ে দিচ্ছে।
যখন বাড়িটা থেকে প্রায় অনেকটা দূরে, ধুম করে একটা শব্দ হাওয়ায় ভেসে এসল। ভূকম্পনের মতো কিছু একটা মনে হলো। আশপাশে লোকজন কম। সবাই ভীত। কিন্তু কেউ কিছুই বলছে না। হঠাৎ করে একটি ছেলেকে দৌড়ে আসতে দেখা গেল। সে–ই চিৎকার করে বলছে, বোম পড়ছে, বোম পড়ছে।
কোথায়?
নাছির-উল্লার বাড়িতে। সবকিছু শ্যাষ হইয়া গ্যাছে।
দ্রুত সেদিকে আবার পা বাড়ালাম। এবার অনেকেই সঙ্গে আছে। বাড়িটার সামনে উপস্থিত হয়ে দেখলাম, বাড়িটা সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সবকিছু গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে। পুকুরের পানি পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে। একটা গাছও অবশিষ্ট নেই। সব কটিই কয়লা হয়ে গেছে। ভেতরের শৈল্পিক পেইন্টিংগুলোর কথা ভেবে খুব খারাপ লাগল। সেগুলো যদি একদম অরিজিনাল কপি হয়ে থাকে, তাহলে একদম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। শেষ তিনজন মানুষ ছিল এই বাড়িতে, তারাও হয়তো এতক্ষণে ছাই হয়ে হাওয়ায় উড়ে গেছে। এতক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখে যতটা মুগ্ধ হয়েছিলাম, সেসব কথা হয়তো কয়েক দিন বাদেই ভুলে যাব। কিন্তু চোখের সামনে এই ধ্বংসলীলা দেখলাম, এই দৃশ্য কি কখনো ভুলতে পারব। হয়তো ভুলতে চাইলেও এমন কেউ আছে, যে কখনো ভুলতে দেবে না।
চোখের কোণে চিকচিক করা জল নিয়ে বাসার দিকে রওনা দিলাম।
বাসায় ফিরে এসে খবর ছেড়ে দেখলাম, সেখানে প্রচার করছে যে পৃথিবীর সর্বশেষ চমৎকার বাড়িটিও কে বা কারা ধ্বংস করে দিয়েছে।
- গল্পটি লেখকের চোখ বিতরণ কর্মসূচি গ্রন্থ হতে নেওয়া হয়েছে।