ক্ষুদিরামের জন্ম হয়েছিল একটি অতি সাধারণ পরিবারে। ভারতের পশ্চিম বঙ্গে মেদিনীপুরে। তাঁর পিতার নাম ত্রৈলোক্যনাথ বসু, মাতার নাম লক্ষ্ণীপ্রিয়া দেবী। জন্ম তারিখ ১৯ অগ্রহায়ণ ১২৯৬ বঙ্গাব্দ, ৩ ডিসেম্বর ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ। দুর্ভাগ্য নিয়ে জন্মে ছিলেন ক্ষুদিরাম। মা যখন মারা গেলেন বয়স তাঁর ছ’বছর। চার মাস পরে বাবা মারা গেলেন।
ক্ষুদিরাম ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠতে লাগলেন। তাঁর শৈশব ও ছাত্রজীবন থেকে তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জানা যায়। ক্ষুদিরাম ছাত্র হিসেবে মনোযোগী ছিলেন না। তবে অন্যান্য গুণাবলী তখন থেকেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। দৃঢ়চেতা ক্ষুদিরামের পরিচয় পাওয়া যায় বিভিন্ন ঘটনায়।
বিভিন্ন রাজনৈতিক জনসভায় বক্তৃতা শুনে শুনে দেশ এবং জনগণের প্রতি দরদ ও ভালবাসা জন্মে ছিল কৈশরকাল থেকেই। আর ভাবতেন ভারতের উপর ইংরেজ যে অন্যায় অত্যাচার করেছে তার প্রতিশোধ নিতে হবে। বিভিন্ন পত্রিকা পড়েও তার মধ্যে ইংরেজ বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠেছিল।
কিংসফোর্ড ছিলেন একজন কুখ্যাত বিচারক, যিনি অনেক পত্রিকা- ওয়ালাদের ও স্বদেশীদের (ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকারী) কারাদণ্ড দিতেন। নিরাপত্তার কারণে কিংসফোর্ডকে কলকাতা প্রেসিডেন্সি হতে বিহারের মজঃফরপুরে বদলী করা হয়। স্বদেশীরা তাকে কসাই কাজী কিংসফোর্ড নাম দিয়েছিল। স্বভাবতই স্বাধীনতাকাঙ্খী বিপ্লবীদের মনে একটা প্রতিহিংসার বাসা বাঁধতে শুরু করছিল। কিংসফোর্ডকে যে করেই হোক খতম করতে হবে।
এই উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী মজঃফরপুরে এক ধর্মশালায় উঠলেন। এখানে ক্ষুদিরামের নাম দুর্গাদাস সেন আর প্রফুল্ল চাকী এখন দীনেশ রায়। ৩০ এপ্রিল ১৯০৮, সন্ধ্যে ৬টা ক্ষুদিরাম প্রফুল্লকে বললেন কিংসফোর্ড ক্লাবে গেছেন। দুজনে দাঁড়ালেন অন্ধকারে গাছের নীচে। গাড়ি ফিরছে, অবিকল সেই গাড়ি, সেই ঘোড়া। খুব কাছে এল গাড়ি। এবার ছুঁড়ে দিলেন বোমা। মারা গেলেন মিসেস পিঙ্গলে কেনেডি ও তার ষোল বছরের কন্যা।
মজঃফরপুরের চব্বিশ মাইল দূরে ওয়াইনি রেল স্টেশনে মুড়ি কিনার সময় ক্ষুদিরামকে গ্রেফতার করে ফতে সিং আর শিউ প্রসাদ। গ্রেফতারের পর ক্ষুদিরামের কাছে পাওয়া গেল ২টি রিভালভার, ১৪টি বড় কার্তুজ, ২৩টি ছোট কার্তুজ, একটি মানি ব্যাগ (যার মধ্য কিছু টাকা ছিল), একটি ঘড়ি, একটি ছেঁড়া টাইম টেবিল, একটি মোমবাতি, একটি দেশলাই। সাথে ছিল একটি কোট ও একটি কোর্তা। পরনে ছিল একটি ধুতি ও একটি সার্ট।
১ মে সোজা সাহেবদের ক্লাবে নেয়া হল ক্ষুদিরামকে। সেখানে ম্যাজিসট্রেট এইচ সি উডম্যান স্বীকারোক্তি আদায় করে নিলেন।
এখানে সংশ্লিষ্ট আইন সম্পর্কে একটু আলোচনা করা যেতে পারে। ক্ষুদিরামের বিচার হয়েছিল মুলত তিনটি আইনের মাধ্যমে। ভারতীয় দণ্ড বিধি ১৮৬০ (The Indian Penal Code 1860, Act 45 of 1860), ফৌজদারী কার্যবিধি ১৮৯৮, (The Code of Criminal Procedure 1898, Act 5 of 1898) ও সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ (The Evidence Act, 1872, Act1 of 1872.) উল্লেখ্য যে সেইসব আইন সামান্য সংশোধনীসহ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এখনও বলবৎ আছে।
ক্ষুদিরামের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল দণ্ডবিধির ৩০২/১১৪ ধারা মাতে। (Khudiram Bose versus Emperor,1908)। সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল সাক্ষ্য আইনের সংশ্লিস্ট ধারাসমূহ প্রয়োগ করে। ক্ষুদিরামের অপরাধ ৩০২ ধারার শাস্তিযোগ্য অপরাধ সন্দেহাতীত প্রমানিত হওয়ায় এই ধারার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। যদিও কোন চাক্ষুষ সাক্ষী ছিল না তথাপি ক্ষুদিরামের স্বীকারোক্তি এবং পারিপার্শিক ও বস্তুগত সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এই চরম দণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
ক্ষুদিরামের স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারা অনুসারে। সর্বসাধারনের জ্ঞাতার্থে ক্ষুদিরামের স্বীকারোক্তিটি উৎকলিত হল:
আমার নাম ক্ষুদিরাম বোস। আমার পরলোকগত বাবার নাম ত্রৈলোক্যনাথ বোস। আমি জাতিতে কায়স্ত এবং পেশায় ছাত্র। আমার বাড়ি মেদিনীপুরে। মৌজা: মেগবিল, জেলা: মেদিনীপুরে। আমি মেদিনীপুরেই বাস করি। কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য আমি কলকাতা থেকে পাঁচ-ছয় দিন আগে মজঃফরপুরে এসে উপস্থিত হই। স্টেশনের কাছে ধর্মশালাতে আমি উঠেছিলাম। আমার সঙ্গে দীনেশ চন্দ্র রায় আরো একজন এসেছিল। সে বলে যে সে বাঁকিপুরের লোক। আমি তাকে হাওড়া স্টেশনেই (প্রথম) দেখেছিলাম, তার আগে তাকে আর কখনো দেখিনি। আমাদের দুইজনের উদ্দেশ্য ছিল এক এবং আমরা উভয়েই একসঙ্গে যাত্রা করেছিলাম। আমি কিন্তু আমার নিজ উদ্যোগে পথে নেমেছিলাম। নানা ধরনের কাগজের সংবাদ পাঠ করে আমি উত্তেজনাবশত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এই কাগজগুলি হল সন্ধ্য্যা, হিতবাদী, যুগান্তর ইত্যাদি। কাগজগুলিতে ভারতের উপর ইংরেজ সরকারের জুলুমের খবর লেখা হত। অবশ্য কিংসফোর্ডের নাম কোথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু যেহেতু তিনি বহু লোককে জেলে পুরেছিলেন সেই কারনে আমি তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেই। আমরা আলোচনা প্রসঙ্গে তাদের কথাও উল্লেখ করেছিলাম। কিন্তু অন্য কেউ তাকে এই কাজ করতে প্ররোচিত করেছিল কিনা সে কথা আমি তাকে জিজ্ঞাসা করিনি। আমাদের হঠাৎ করেই দেখা হয়েছিল এবং (সেই সুবাদেই) তার সঙ্গে আলোচনার সূত্রপাত । কথা প্রসঙ্গে সে (যেমন) তার উদ্দেশ্যের কথা আমাকে জানায় আমিও (তেমনি) আমার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাকে অবহিত করি। গাড়িতে আরো অনেক যাত্রী ছিলেন। কিন্তু আমি তাদের কারো সঙ্গেই কথা বলিনি। আমরা মজঃফরপুরের ধর্মশালায় পৌঁছে সেখানে চার-পাঁচ দিন অবস্থান করি এবং তাকে (কিংসফোর্ড) মারার সুযোগ সম্বন্ধে আলাপ- আলোচনা করি। দু-এক দিন বাইরে বেরিয়ে তার বাড়িটিও পর্যবেক্ষণ করে আসি। আমার কাছে দুটি রিভলবার ছিল এবং আমার ইচ্ছা ছিল তার একটি দিয়ে তাকে গুলি করে মারি। এইগুলি হল সেই রিভলবার দীনেশের কাছে ছিল একটি রিভলবার ও একটি বোমা। সে এটি ( বোমা) কলকাতা থেকেই তৈরী অবস্থায় নিয়ে এসেছিল এবং ধর্মশালায় বসে বানায়নি। তবে ধর্মশালায় বসে সে কী-যেন করত। আমি বাইরে থেকে ঘরে ফিরে এসে দেখতাম যে সে বোমাটি বার করে আবার যথাস্থানে রেখে দিত। দীনেশ আমাকে বলেছিল যে এই বোমাগুলি কেমন করে বানাতে হয় সে তা জানে। কিন্তু বোমাটি সে কোথা থেকে জোগাড় করেছিল সে কথা আমাকে বলেনি। বোমাটি টিন দিয়ে মোড়া ছিল এবং তার আকার প্রায় এতখানি ( হাত দিয়ে তিন-চার ইঞ্চি ব্যাসার্ধের একটি আয়তন প্রদর্শন)।
আমরা পৌঁছানোর দুদিন পরে বোমাটি কাজের উপযোগী হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মশালায় একটি গ্ল্যাডস্টোন ব্যাগের ভিতরে কাপড় ও অন্যান্য জিনিস দিয়ে আমরা সেটি ঢেকে রেখেছিলাম। দুই তিন দিন আমি বোমাটিকে একটি টিনের মধ্যে পুরে বাইরেও নিয়ে গিয়েছিলাম। দীনেশ এবং আমি দু-তিন দিন সন্ধ্যেয় বেরিয়ে জজ সাহেবের বাড়ির সামনের ময়দান দিয়ে হেঁটে এসেছিলাম। আমি তাকে (কিংসফোর্ডকে) দু-তিনবার দেখেও ছিলাম । কিন্তু কোন সুযোগ পাইনি। আমরা তাকে (ঘোড়ার) গাড়ীর ভিতরেও বসে থাকতে দেখেছি। কিন্তু সব কিছু পরিস্কার ভাবে ঠাহর করতে পারিনি।
গতকাল রাতে আমি একটি সুযোগ পেয়েই বোমাটি ছুঁড়ে মারলাম। দীনেশ এবং আমি ময়দানে একটি গাছের তলায় একত্রে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি দেখলাম (কিংসফোর্ডের) গাড়ীটি ক্লাব থেকে বেরিয়ে আসছে। আমি মনে করেছিলাম যে কিংসফোর্ডের (ঐ) গাড়ীটি আমি সঠিকভাবে চিনতে পেরেছি। আর তাই বোমাটি ছুঁড়ে মারলাম। (অবশ্য) এখন জানতে পারলাম যে আমার ভুল হয়েছিল। কনস্টেবলেরা আমাকে গ্রেফতার করে। আমি কিন্তু (মাত্র) একটি বোমাই ছুঁড়েছিলাম। আমি রাস্তায় নেমে গাড়ীটির কাছে ছুটে গিয়ে তার ভিতরেই এটি নিক্ষেপ করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম যে জজ সাহেব বুঝি গাড়ীর ভিতরেই রয়েছেন। কিন্তু আসলে সেখানে কয়জন ছিল তা আমি ভালমত ঠাহর করতে পারিনি। তখন আমার গায়ে ছিল এই ডোরাকাটা কোট। দীনেশের গায়ে ছিল একটা সাদা রঙের এর সিল্কের কোর্তা । কিন্তু এটি পরে থাকতে অসুবিধা হওয়ায় সে এটি গাছ তলায় দাঁড়িয়ে থাকার সময় গা থেকে খুলে আমায় দিয়েছিল। সে তখন একটি জামা ও চাদর গায় দিয়ে নেয়। আমাদের (দুজনের) পায়েই জুতা ছিল। কিন্তু বোমা ফেলার আগে আমরা গাছতলায় ওগুলি ছেড়ে রেখেছিলাম। আমি বোমা ছোঁড়ার জন্য সর্বাগ্রে ধেয়ে গিয়েছিলাম। আর তাই দীনেশ কেমনভাবে আমাকে অনুসরণ করেছিল তা খেয়াল করতে পারিনি। দীনেশের কাছেও একটি রিভালবার ছিল। তবে সেটি (তখন) তার হাতে ছিল কি না তা লক্ষ করিনি। সে গুলি ছুড়েছিল কিনা তাও বলতে পারব না। বোমা নিক্ষেপের ফলে আমি কোন আঘাত পাইনি। কিন্তু দীনেশ আঘাত পেয়েছিল কি-না তা জানিনা। আমরা কিছুটা সময় একযোগে ধর্মশালার দিকে ছুটে গিয়েছিলাম এবং তার পরে আলাদা হয়ে যাই। আমি (রেল) লাইন ধরে এগোনোর পর সমস্তিপুরের রাস্তায় এসে উঠেছিলাম। (আর) ধর্মশালার থেকে আলাদা হয়ে পড়ার সময় দীনেশ সিধে পথে ছুট দিয়েছিল।
ধর্মশালার কাছে ছুটে আসার সময় একজন কনস্টেবল আমাদের ডেকেছিল, কিন্তু আমরা তা কানে না তুলে চুপিসারে ছুট মেরেছিলাম। ঐ দিন রাত ৭:৩০ মিনিট নাগাদ আমরা যখন জজ সাহেবের বাড়ির কাছে অপেক্ষা করেছিলাম তখন দু-জন লোক আমরা কোথায় থাকি সে কথা এসে জিজ্ঞাসা করেছিল। আমি বলেছিলাম যে আমি কিশোরী বাবুর সঙ্গে থাকি। তিনি ধর্মশালার ম্যানেজার, তাই তার নাম জানতাম। কিন্তু আমাদের সঙ্গে তাঁর (কখনো) সাক্ষাৎ হয়নি। (যাহোক) ঐ লোকটি তারপর আমাদের ওখান থেকে চলে যেতে বলে, কেননা সে পথ দিয়ে নাকি সাহেবরা যাতায়াত করেন। আমি বলেছিলাম যে আমি একটি ছেলের জন্য অপেক্ষা করছি। সে এলেই চলে যাব। তারপর আমরা পূর্ব দিক ধরে চলে যাই। আমরা কিছুটা পথ এগিয়ে আবার ফিরে আসি। সেই জজ সাহেবের কাছারি এবং পুকুরসংলগ্ন গাছতলায় যেখানে আমরা (জজ সাহেবের ঘোড়ার) গাড়ীটি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলাম। লোক দুইটির সঙ্গে আমার যখন কথা হচ্ছিল তখন বোমাটি আমার বাঁ হাতেই ধরা ছিল। আমার হাতটা ঝুলছিল। বোমাটি একটা টিনের বাক্সে রাখা ছিল। গাছতলায় পৌঁছার আগেই আমরা এই টিনের বাক্সটি ছুঁড়ে ফেলেছিলাম।
বোমাটি যদিও দীনেশের তবুও আমি ওটা ছুঁড়েছিলাম, কেননা এই কাজে আমারই বেশী ইচ্ছা ছিল। ধর্মশালা থেকে পালিয়ে যাবার সময় আমি সেখানে একটা ধুতি ফেলে এসেছিলাম। দীনেশ কিছু ফেলে দিয়েছিল কিনা তা আমার জানা নেই। দীনেশের বয়স প্রায় আমারই মত, তার গোলপানা মুখ এবং শরীরের গঠন আমার থেকে কিছুটা ভাল। তার উচ্চতাও আমারই মত এবং ভ্রুজোড়া আলাদা এবং আমার মত তারও চুল কালো এবং কোঁকড়া। সে বলেছিল তার একজন ভাই বাঁকিপুরে চাকরি করে।
খবরের কাগজ পড়া ছাড়াও আমি বিপিন পাল, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, গীতস্পতি কাব্যতীর্থ প্রমুখের বক্তৃতা শুনতাম। বিডন স্কোয়ার এবং কলেজ স্কোয়ারে (প্রভৃতি মাঠে) এই সব বক্তৃতা দেওয়া হত এবং সেগুলি শুনে আমি এই কাজে অনুপ্রাণিত হয়েছি। বিডন স্কোয়ারে একজন শক্ত সমর্থ সন্ন্যাসিও একবার বক্তৃতা করেছিলেন। কলকাতায় আমি আমার মামা সতীশচন্দ্র দত্তের সঙ্গে থাকতাম। তিনি আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। তিনি একজন স্কুল শিক্ষক এবং কর্পোরেশন স্ট্রীটের ৪ নম্বর কি ৫ নম্বর বাড়ীতে থাকতেন। তাঁর স্কুলটিও ছিল ঐ কর্পোরেশন স্ট্রীটেই।
এই কার্তুজগুলি (২৩ টি ছোট ও ১৪টি বড়) আমারই এবং কনর্ওয়ালিশ স্ট্রীট ও বৌবাজার স্ট্রীটের একটি বাজার থেকে আমি এগুলি কিনেছিলাম। আমার কোন লাইসেন্স ছিল না। অমূল্যরতন নামে একটি ছেলে আমাকে রিভলভার এনে দিয়েছিল। আমি তাকে এর জন্য ১৫ টাকা দিয়েছিলাম। এটা প্রায় দু মাস আগেরকার ঘটনা। এই ঘড়িটি আমার এবং এই রেলওয়ে টাইমটেবল ও এই মোমবাতি এবং দেশলাইটিও । আমার এই টাকার ব্যাগটিও আমার, এতে তিনটে ১০ টাকার নোট একটা (কাঁচা) টাকা, একটি দুয়ানি এবং কিছু খুচরো পয়সা (মোট ৩১ টাকা ৭ আনা ৩ পাই) রয়েছে।
এই টিনের কৌটাটিও আমার। এর ভিতরেই বোমাটি একটি কাপড়ে জড়িয়ে রাখা ছিল। এই জুতা জোড়াটি আমার এবং ঐ ছেঁড়াটি দীনেশের। ঐ চাদরটা দীনেশের। সে ওটি মাথায় জড়িয়ে রাখত। চাদরের একটি টুকরো দিয়ে বোমাটি জড়িয়ে টিনের কৌটায় পুরে রাখা হয়েছিল। চাদরটা অন্তত দু তিন বার ছেঁড়া হয়েছিল। আমি প্রায় এক বছর আগে মেদিনীপুর কলেজ পরিত্যাগ করি।
প্রশ্ন: এই বিবৃতির সবটুকু কি তোমার?
উত্তর: আমি যা বলেছি সব সত্যি এবং আমি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় এই বিবৃতি দিয়েছি।
ক্ষুদিরামের স্বীকারোক্তি পাঠ করলে বোঝা যায় যে, যা সত্য তাই বলেছেন। তার তাৎক্ষণিক দু’টা কারণ থাকতে পারে। প্রথমত: তাঁর বিপদের সময় কোন উকিল বা কেউ পরামর্শ দেওয়ার মত ছিল না। দ্বিতীয়ত: ক্ষুদিরামের ধারনা ছিল দীনেশকে পুলিশ ধরতে পরেনি। তাই বিপ্লবী দলের দীক্ষামত তিনি বোমা মারা সকল দায় নিজের ঘাড়েই নিয়েছিলেন। যাতে দীনেশ যদি কোনদিন ধরাও পরে তবে তাঁর যেন শাস্তি না হয়। কিন্তু দীনেশের মৃতদেহ তাঁকে দেখানোর পর ক্ষুদিরামের ভুল ভেঙ্গে যায়। প্রচলিত ধারনা যে পুলিশ কর্তৃক ভীষণভাবে অত্যাচারিত হয়ে আসামীগণ স্বীকারোক্তি করে থাকে। তবে এ-কথাও সত্য যে অত্যারের ভয়ে যারা স্বীকারোক্তি করে থাকে সেই একই ভয়ে এ-কথা ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকাশ করে না। কিন্তু ক্ষুদিরাম অত্যাচারের ফলে স্বীকারোক্তি করেননি। তিনি পুলিশের অত্যাচার সর্ম্পকে কোন অভিযোগ করেননি। এমনকি যারা তাঁর সাথে দেখা করেছেন তাদের কাছে তিনি বলেননি এবং তারা অত্যাচারের কোন আলামত দেখেননি।
মজঃফরপুরের আদালতে বিচার করতে এলেন বাঁকিপুরের দায়রা জজ মি কার্নডাফ। ক্ষুদিরামের পক্ষের উকিলরা অপরাধ অস্বীকার করার পরামর্শ দিলেও সত্যাবাদী ক্ষুদিরাম অপরাধ স্বীকার করলেন জজ কার্নডাফের কাছে। ১৩.৬.১৯০৮ তারিখে জজ সাহেব আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁর প্রাণদণ্ডের আদেশ দিলেন। জজ আরও জানালেন, ক্ষুদিরাম ইচ্ছা করলে সাতদিনের মধ্যে এই বিচারের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে এবং বিনা খরচায় তাঁকে এই মামলার নথিপত্রের একপ্রস্ত দেওয়া হবে।
ক্ষুদিরাম মৃদু মৃদু হাসছেন লক্ষ করে বিচারকের মনে হল হয়ত ইংরেজিতে প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ড আসামি বুঝতে পারেনি।
সমসাময়িক পত্রিকা সঞ্জীবনী (১৮.৬.১৯০৮) পত্রিকা থেকে তার মনোভাব বোঝা যায়।
“একেবারে নির্লিপ্তভাবে ক্ষুদিরাম দণ্ডাজ্ঞা শুনিলেন। কি নিম্ন আদালতে, কি উচ্চ আদালতে ম্যাজিট্রেটের নিকট মামলা শুনানিকালে ক্ষুদিরাম অধিকাংশ সময়েই নির্লিপ্তভাবে কাটাইতেন। কখনো কখনো তাঁহাকে নিদ্রিত অবস্থা দেখা যাইত। আদালতে কি হইতেছে না হইতেছে সে সমন্ধে ক্ষুদিরাম প্রায়ই উদাসীন থাকিতেন। মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞার পর ক্ষুদিরামকে সম্পুর্ণ অবিচলিত দেখিয়া এবং তাঁহার নির্বিকার ভাব লক্ষ্য করিয়া বিচারকের মনে সম্ভবত এই ধারণার বশবর্তী হইয়া ফাঁসির হুকুমের পর জজ ক্ষুদিরামকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তোমার প্রতি যে দণ্ডের আদেশ হইল তাহা বুঝিতে পারিয়াছ?’
ক্ষুদিরাম হাস্যমুখে মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘হাঁ, বুঝিয়াছি।’
জজ সাহেবের অনুমতি নিয়ে ক্ষুদিরাম কিছু বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু সময় পার হয়েছে বলে জজ সাহেব তাঁকে থামিয়ে দিলেন। নাছোড়বান্দা ক্ষুদিরাম তবু বলল, ‘কি করে বোমা বানাতে হয়, সে কথা একবার সকলকে শুনিয়ে যেতাম।’ কিন্তু সে কথা আর কোনদিন বলা হয়নি। মরার আগে জন্মভূমি মেদিনীপুর দেখার এবং দিদি ও ছেলেমেয়েগুলিকে দেখার শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়নি ক্ষুদিরামের ।
এক উকিলের প্রশ্নের জবাবে ক্ষুদিরাম বলেছিলেন, “আমার মা নাই, বাবা নাই, ভাই নাই, কাকা নাই, মামা নাই।” ছোটবেলার আদর স্নেহহীন ফাঁকা হৃদয় পূর্ণ করেছিলেন দেশপ্রেম দিয়ে। উকিলকে জানান তাঁর মনে কোন দুঃখ নাই। তাঁর মনে কোন ভয় নাই। উকিল যখন জানতে চাইল অপরাধ কেন স্বীকার করলেন, তার উত্তরে ক্ষুদিরামের পাল্টা প্রশ্ন কেন স্বীকার করব না?
কলকাতা হাইকোর্টে আপিল হইল। বিচারপতি জে. ব্রেট এবং জে. রাইভস্ এর এজলাসে শুনানি হল। ১৩ জুলাই তার রায় বের হল। কাজের কাজ কিছুই হল না। মৃত্যুদণ্ডই বহাল রইল। এখানে বলে রাখা ভাল তাঁর পক্ষের উকিলগণ যখন তাঁকে বোঝালেন যে প্রফুল্লকে শাস্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য তুমি যদি স্বীকারোক্তি করে থাক তবে তা ইতোমধ্যে ভেস্তে গেছে। তবে বেঁচে থাকলে দেশের আরও সেবা করার সুযোগ পাবে। তোমার পূর্বের স্বীকারোক্তি অস্বীকার করতে হবে। উকিলদের এই প্রস্তাব তার মনঃপূত হয়েছিল কিনা তা বুঝা যাইনি। ক্ষুদিরামের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছোটলাট, বড়লাট এমনকি সম্রাটের কাছে প্রাণ ভিক্ষার অবেদন করা হয়েছিল। সকল প্রচেষ্টাই বৃথায় গেল। উল্লেখ্য যে শ্মশানে অন্ত্যোটিক্রিয়ার সময় ক্ষুদিরামের আত্মীয়-স্বজন বলতে কেউ হাজির ছিলেন না। এমন কী যাদের লেখা ও বক্তৃতা ক্ষুদিরামকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল তাদেরকেও দেখা যায়নি।
ক্ষুদিরামের আত্মবলীদান নিয়ে বাঁকুড়ার লোক কবি পিতাম্বর দাসের লেখা ও লতা মুঙ্গেসকরের গাওয়া প্রাণস্পর্সী গান আজও বাঙ্গালি হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়:
একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি
হাসি হাসি পড়ব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী।
সত্যই হাসতে হাসতে ফাঁসি পড়েছিলেন কারণ তাঁর কাছে জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় – ‘ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয় গান’ — ক্ষুদিরাম তো তাঁদেরই একজন।
বল বীর-
বল উন্নত মম শির।
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর।
মনে পড়ে রবি ঠাকুরের অমর বাণী:
‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই ওরে ক্ষয় নাই।’
সত্যই ক্ষুদিরামদের ক্ষয় নেই। ক্ষুদিরামরা অমর, অজেয় এবং দেশপ্রেমীদের মনের মণিকোঠায় যাঁদের অবস্থান।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত যথার্থই বলেছেন।
‘দেশবৈরী নাশে যে সমরে,
শুভক্ষনে জন্ম তার, ধন্য বলে মানি।’
এবং
‘সেই ধন্য নরকুলে,
লোকে যারে নাহি ভুলে,
মনের মন্দিরে সদা সেবে সর্ব্বজন।’
ভূমিকায় লিখেছিলাম –দুর্ভাগ্য নিয়ে জন্মে ছিলেন ক্ষুদিরাম– সেটা মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে। আজ বলতে ইচ্ছে করছে- ক্ষুদিরাম, তুমি ধন্য, তুমি ক্ষণজন্মা। তুমি আমদের শিখিয়েছ দেশকে কিভাবে ভালবাসতে হয়। তুমি শিখিয়েছ — চিরজীবি হওয়ার জন্য বেশীদিন বাঁচার দরকার নেই এবং গীতার বাণী– পরিত্রাণয় সাধুনাং বিনাশায় চ দুস্কৃতাম — তার বাস্তবায়ন কিভাবে করতে হয়। Shakespeare তাঁর বিখ্যাত নাটক Julius Ceaser-এ লিখেছেন, “The valiant never taste of death but once.” ক্ষুদিরাম তো এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
Ernest Hemingway তাঁর বিখ্যাত বই The Old Man and the Sea -এ লিখেছেন, “Man is not born for defeat… a man can be destroyed but not defeated.” এ কথার সাথে তাল মিলিয়ে বলতে হয় ক্ষুদিরাম পরাজিত হওয়ার জন্য জন্মাননি, তাঁকে ধ্বংস করা হয়েছিল কিন্তু পরাজিত করা যায়নি। তিনি বেঁচে আছেন সব বাঙ্গালীর হৃদয়ে। দেশের জন্য এরূপ নির্মোহ আত্মত্যাগ মানব জাতির ইতিহাসে ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। তাঁর নির্ভীক দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ যুব সমাজকে বিপ্লবী মন্ত্রে আজও উদ্বুদ্ধ করে।
আজ আমাদের ভাবতে হবে, ক্ষুদিরামের মত বীর বাঙ্গালী নিজের জীবন উৎসর্গ করে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার (যুদ্ধের) সূচনা করেছে। ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। ক্ষুদিরামের দেখানো পথ ধরেই আমরা আমাদের দেশ বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। তা’হলে ক্ষুদিরাম কি আমাদের পূর্বসুরি নয়? আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা কি ক্ষুদিরামের যোগ্য উত্তরসুরি নয়? এ প্রশ্ন মনে আসতেই পারে।
মো: নাজমুল হক পিপিএম: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আই জি, বাংলাদেশ পুলিশ।