রূপকথার ভাতের থালা

শহরের এক কোণে ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট বাড়ি। এই ফ্ল্যাট বাড়ির ঠিকানাটা তোমাদের বলছি না, বললেই তোমরা চিনে ফেলবে। সেই ফ্ল্যাট বাড়ির দক্ষিণ দিকের জানালার পাশে নীল রঙের একজোড়া পর্দা দুলতো, আর সেই জানালার নিচেই বসে থাকত ছোট্ট অরণি।

অরণি খুব লক্ষ্মী মেয়ে। দুপুরের কড়া রোদ যখন বারান্দার গ্রিল ছুঁয়ে ভেতরে আসত, তখন অরণির সামনে আসত এক থালা গরম ভাত। আর ঠিক তখনই অরণির হাতে চলে আসত এক জাদুর আয়না—তার বাবার স্মার্টফোন! মানে মোবাইল, এটা ছাড়া অরণী ভাত খেত না।

অরণি যখন ভাতের গ্রাস মুখে তুলত, তার চোখ থাকত সেই রঙিন পর্দায়। টম আর জেরি দৌড়াচ্ছে, মিকি মাউস হাসছে, আর অরণি কলের পুতুলের মতো মুখ নাড়ছে।
সে জানত না আজ মা ডাল দিয়ে আলুভর্তা মেখেছেন নাকি মাছের ঝোল। তার জিভ স্বাদ ভুলে গিয়েছিল, চোখ ভুলে গিয়েছিল খাবারের রূপ। অরণীর আম্মু বলেন, ‘মামনি বলো তো তুমি এখন কী মাছ দিয়ে ভাত খাচ্ছো?’
অরণী বলে, ‘পুটিমাছ!’
আম্মু অরণীর মাথায় একটা চাটি মেরে বলে, ‘আরে বোকা মেয়ে, এটা পুঁটিমাছ না, ইলিশ মাছ!’
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবতেন, আমার মেয়েটা কি কোনোদিন জানবে না যে ভাতেরও একটা সুগন্ধ আছে?

এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে ঘটল এক অলৌকিক কাণ্ড। অরণি তখন মোবাইলে একটা রাজকন্যার গল্প দেখছিল। হঠাৎ ঘরের কোণে পুরনো আলমারির আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন এক দাদু। তাঁর পরনে ধবধবে সাদা পিরান, আর চোখে একজোড়া পান্না-সবুজ চশমা। দাদু স্মিত হেসে বললেন, ‘অরণি, তুমি কি এই জাদুর আয়নাটার ভেতর বন্দি হয়ে আছ?’
অরণি অবাক হয়ে বলল, ‘না তো দাদু! আমি তো কার্টুন দেখছি। তুমিও দেখবে এসো।’
দাদু অরণির থালার দিকে ইশারা করে বললেন, ‘কিন্তু তোমার থালায় যে এক হাজার রাজপুত্র আর রাজকন্যা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে, তাদের তো তুমি চিনতেই পারছ না।’
অরণি খিলখিল করে হেসে উঠল, ‘দাদু তুমি কত বোকা! থালায় তো শুধু সাদা ভাত, আলুভর্তা আর ডাল, না না একটা ডিমও আছে।’

দাদু তখন নিজের সবুজ চশমাটা খুলে অরণির চোখে পরিয়ে দিলেন। আর অমনি কী আশ্চর্য! অরণি দেখল চারপাশটা যেন এক রূপকথার দেশ হয়ে গেছে।
তার সাদা প্লেটটা এখন আর সাধারণ থালা নেই, ওটা হয়ে গেছে একটা বিশাল রুপালি মাঠ। সেই মাঠে ভাতের দানাগুলো ছোট ছোট সাদা পরীর মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে। পাশের ডালটুকু মনে হচ্ছে এক চিলতে গলানো সোনার নদী, যা বয়ে চলেছে থালার এক কোণে। আর ওই এক টুকরো লেবু? সে তো এক বনের রাজপুত্র! তার গা থেকে কী মিষ্টি একটা ঘ্রাণ বেরোচ্ছে!

হঠাৎ একটা ভাতের দানা নড়েচড়ে উঠল। সে মিষ্টি গলায় অরণিকে বলল, ‘অরণি! আমরা কত কষ্ট করে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাঠ থেকে তোমার কাছে এসেছি তোমাকে শক্তি দিতে। কিন্তু তুমি তো আমাদের দিকে তাকাওই না। তুমি শুধু ওই কাঁচের বাক্সের নকল পুতুলদের দেখো। আমরা খুব মন খারাপ করছি, আমাদের সাথে একটু গল্প করো না তুমি!’

অরণি দেখল, সে যখন মোবাইলের দিকে তাকাচ্ছে, এই সুন্দর রূপকথাটা ধোঁয়া হয়ে যাচ্ছে। সবুজ চশমার ভেতর দিয়ে মোবাইলটাকে দেখতে লাগল একটা কালো গর্তের মতো, যা অরণির চারপাশের সব রং শুষে নিচ্ছে।

দাদু মৃদু স্বরে বললেন, ‘দিদিভাই, প্রকৃতি আমাদের প্রতি বেলা এক একটা রূপকথা উপহার দেয়। মা যখন ভালোবাসা দিয়ে ভাত মাখেন, তাতে পৃথিবীর সবচাইতে দামি জাদু থাকে। তুমি যদি অন্য কোথাও তাকিয়ে থাকো, তবে সেই জাদু তোমার ভেতরে পৌঁছাবে না।’

অরণি চট করে চশমাটা খুলে ফেলল। দাদু আর নেই, কিন্তু চশমার রেশটা যেন রয়ে গেছে। সে দেখল মা সামনে বসে চিন্তিত মুখে তাকে দেখছেন। অরণি এবার নিজের হাতে মোবাইলটা সরিয়ে দিল। সে আলতো করে এক দলা ভাত মুখে তুলল। আচমকা তার মনে হলো, ভাতের ভেতর মাঠের সোঁদা গন্ধ লুকিয়ে আছে! আলুভর্তার ভেতর মায়ের আঙুলের আদর মিশে আছে। লেবুর টুকরোটা চিপতেই সারা ঘর এক অদ্ভুত সতেজ ঘ্রাণে ভরে গেল।

সেদিন প্রথম অরণি বুঝল, আসল রূপকথা মোবাইলের পর্দায় থাকে না; আসল রূপকথা থাকে মাটির গন্ধে, শস্যের স্বাদে আর মা-বাবার চোখে চোখ রেখে গল্প করায়।

মা অবাক হয়ে দেখলেন, অরণি আজ একটার পর একটা ভাতের গ্রাস মুখে তুলছে আর হাসছে। অরণি বলল, মা, জানো? এই ভাতগুলো সাদা পরীর মতো! আমি ওদের সাথে গল্প করতে করতে খাব, আজ আর কার্টুন দেখব না…’

মা অরণীর কথা কিছু বুঝলেন না কিন্তু অরণির খুশি খুশি মুখটা দেখে বললেন, ‘আজকের রান্না খুব মজা হয়েছে বুঝি?’

অরণী মাকে জড়িয়ে ধরে বরল, ‘খুব মজা হয়েছে আম্মু…’

মাসুম বিল্লাহ: গল্পকার