স্নো গুজ বা বরফ রাজহংসীরা নভেম্বরের মাঝামাঝি উড়তে শুরু করেছিল। উত্ত্র কানাডার আলবার্টা হ্রদে তাদের বাড়ি। আর কদিন পরই এখানকার তাপমাত্রা মাইনাসের ২০ ডিগ্রি নিচে নেমে যাবে। হ্রদ যাবে জমাট হয়ে। আশপাশের গাছপালা সব পাতাশূন্য, বরফের চূর্ণে ঢাকা পড়ে যাবে। মাছেরা নিজেদের অভিযোজিত করতে জমাট হ্রদের অনক নিচের স্তরে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ জলের স্তরে লুকোবে। আর তখন খাদ্যসংকট দেখা দেবে রাজহংসীদের। তাই নভেম্বরের শুরু থেকেই তাদের পরিকল্পনা শুরু হয়ে যায়। মাইগ্রেশনের পরিকল্পনা। কোথায় কোন দিকে কতদূর যাবে তা তারা আগেই ঠিক করে ফেলে। মাথার ভেতর আছে তাদের আশ্চর্য এক জিপিএস সিস্টেম, যা অত্যাধুনিক বিমানের জিপিএস সিস্টেমের চেয়েও শক্তিশালী। কি চিহ্ণ চিনতে তাদের কখনো ভুল হয় না।
ঘন্টায় ৪০ থেকে ৫০ মাইল উড়তে পারে তারা এ সময়। এই বাড়তি পরিশ্রমের জন্য শরিরে জমিয়ে রাখে মেদ, যা এই সময় খরচ হয়। এবার তারা প্রায় ৬ হাজার মাইলের ওপর উড়বে। উড়তে উড়তে যেখানে মন চাইবে, রাত নামবে, সেখানে আশ্রয় নেবে। গন্তব্য অনেক দূরের এক দেশ। সেই দেশের উত্তর পশ্চিম দিকে একটা বড় বিল আছে, নামটা অদ্ভুত-বাইক্কা বিল। সেই বিলের চারদিকে ঘন গাছের সারি। বিলে ছোট মাছ আর প্ল্যাংকটনের অভাব নাই। তাপমাত্রা কখনো ১৫ ডিগ্রির নিচে নামে না। বাইক্কা বিল হল পাখিদের অভয়ারণ্য। গেলবার বাপ কাকাদের কাছে এই বিলের খবর পেয়েছে স্নো গুজ। এবার মেক্সিকোর পথে না গিয়ে সেই বাইক্কা বিলেই যাবে বলে ঠিক করেছে সে।
পথ চলতে স্নো গুজের বন্ধু হবে অনেক। আলাস্কা আর সাইবেরিয়া থেকে সঙ্গী হবে স্যান্ডহিল ক্রেন বা বক। রাশিয়া থেকে আসবে হোয়াইট স্টর্ক আর স্পুনবিল। তারা সকলে মিলে উড়তে উড়তে প্রথম যাবে কেরালা, তারপর একটু ঘুরে মঙ্গোলিয়া, তারপর চীনের একটি প্রদেশ হয়ে বাংলাদেশের সিলেটে। মাঝ ডিসেম্বরে জায়গামত পৌঁছাবে স্নো গুজ। থাকবে একেবারে মধ্য ফেব্রয়ারি পর্যন্ত। তারপর আবার প্রস্তুতি শুরু ফিরে আসার। হযতো মার্চের দিকে ফিরে আসবে আবার আলবার্টা হ্রদে।
কিন্তু এবার আজব এক সঙ্গী জুটেছে আমাদের স্নো গুজের। দেখতে হোয়াইট ক্রেন বা সাদা বকের মতই। ঠোঁটগুলো হলদে। পা দুটি খ্যাংড়াকাঠির মত। কিন্তু তার চোখগুলো অদ্ভুত। ছাই রঙা সেই দুটি চোখে যেন কোন প্রাণ নেই। সারাক্ষণ চক চক করে কাচেঁর মত। সঙ্গীটি বেশি মিশতে চায় না, কথাও বলে না। তবে তার নেভিগেশন ক্ষমতা অত্যাশ্চর্য। পৃথিবীর মানচিত্র যেন তার দখলে। যত দিন যায়, স্নো গুজ তত অবাক হয় তাকে দেখে। একদিন উঁচু এক বাবলা গাঝে বিশ্রাম নিতে গিয়ে সে একদিন বলেই ফেলে-তুমি আমার চেনা আর সব ক্রেনদের মত নও তো। তুমি কে গো?
হোয়াইট ক্রেন তার নির্জীব দুটি চোখ মেলে খনখনে যান্ত্রিক গলায় বলে-আমি ড্রোন।
তানজিনা হোসেন: কথাসাহিত্যক ও চিকিৎসক।