ধুম কুয়াশার ভেতর রানওয়ের মতো তীক্ষ্ন সোজা হাফ কিলোমিটার রাজিয়া সুলতানা রোড দিয়ে এত মানুষ হাঁটাচলা করে যে, একটা সাদা ও অনুভূতিশীল সুড়ঙ্গ তৈরি হয়ে যায়। কখনো কখনো বিভ্রম হয়, তারা হয়তো দুই তারে ছড়ানো সাদা শাড়ির ভেতর দিয়ে হাঁটছে। এমনি এক শীতের সন্ধ্যায় (বিশেষ দিন বলেই মনে থাকা, সেটা ফেব্রুয়ারির ঠিক ২৬ তারিখ) বাসায় ফিরে দেখি মৌরির প্রসাধনহীন বাম চোখের পাপড়িগুলো ঝরে যাচ্ছে। প্রায় ন্যাড়া হয়ে গেছে তখুনি। কথাটা মৌরিকে বলতেই খুব নিস্পৃহভাবে বলল-ও, তাহলে শুরু হয়ে গেছে। আমি অনুধাবন করছিলাম, এটা ওর সঙ্গে আমার অনন্ত ঘটনা শুরুর নমুনা। যেমনটা শুরু হতে পারত সহকর্মী বর্ণা ফেরদৌসীর সঙ্গে। দশ বছর আগে আমরা যখন একই অফিসে কাজ করতাম-অপ্রতিদ্বন্দ্বিতার ভান করে। মৌরি যে পাপড়ি ঝরার কথা বলছে না, আমি নিশ্চিত। তাই চুপ করে গেলাম। কিন্তু ফ্যাশন-দুরস্ত মৌরি কি এখন আয়নাও দেখে না! মুঠোফোনে ওর চোখের একটা ছবি তুলে দেখাতে চেষ্টা করলাম। আয়নায় বোঝা যাবে না এমন পাপড়ি ঝরার ছবি মুঠোফোনের ক্যামেরায়ও খুব আসছিল না। তখনই ভেবে ছিলাম মৌরির সুন্দর পাপড়িগুলো হারিয়ে যাওয়ার আগে ওর একটা ছবি তুলে রাখব।
মৌরির চেহারাই এমন, যাকে বলে ফটোজেনিক লুক। মাঝারি উচ্চতায় মজবুত গড়ন। প্লাস্টিক সার্জারি নয়, না বললে যে টান টান দুই গাল কেউ বুঝতে চায় না, তার মধ্যে শক্ত-টিকোলো নাক। তার নিচে সসীম ঠোঁট ওর নাককে দিয়েছে গৌরবজনক উচ্চতা-আমি যদি অতিরঞ্জন না করে থাকি-মনে হয় এর চেয়ে বড় ঠোঁট সেখানে মানানসই হতো না। জোড় ভ্রুর নিচে বাদামি চোখ। প্লাস্টিক রিমের চশমাটা ওর চোখের সীমানাটাকেও করে দেয় সসীম, কিন্তু অনির্দিষ্ট। সাদা পোশাকে ওকে মনে হতো শৈশবে হারিয়ে যাওয়া এক সাদা পালের নৌকা। বিশেষ করে জিন চাপানো ঘোড়ার পিঠের মতো ঈষৎ বেঁকে যাওয়া কটির ওপরে জামাটায় দুই ফালি সেলাই দিয়ে চাপানো থাকত। যদিও মৌরি কখনোই আমার সামনে ক্যাবারে নাচিয়েদের মতো সিনা দুলায়নি, তবু তাকে আমি তুলনা করতে পারি টোপতোলা সাপের স্ফীত বুকের সঙ্গে, যা আমাকে উত্তেজিত করত সংবেদনশীলভাবেই।
ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে পড়তে পড়তে ফ্যাশন আর্টের প্রতি ওর ঝোঁক পড়ে গিয়েছিল। নামদার ফ্যাশন হাউসে কাজ করার সুবাদে দু-দশবার ফটোমডেল হতে হয়েছিল তাকে। ক্যামেরা অধিক দৃশ্য ধারণে পাণ্ডিত্য দেখান এক ফটোগ্রাফারের সঙ্গে ওর সম্পর্ক ছিল তখনই। তরুণ লেখকদের মতো সে চেষ্টা করত সব সময়ই যে কোনো দৃশ্যকে কীভাবে যৌক্তিক ও ছবির অধিক অনুভূতিতে নিয়ে যাওয়া যায়, তা ব্যাখ্যা করে সবাইকে সম্মোহিত করার। এমনকি লাঞ্চে বসে ছবি নিয়ে একটি বাক্য ব্যয় না করেও রেস্টুরেন্টের ছোট্ট টেবিলের এক কোনায় ক্যামেরা আর দশাই সাইজের লং-সুট লেন্সটা দাঁড় করিয়ে মনে করত-‘লাঞ্চ উইথ রঘু রায়’। কখনো লেন্সের দাম, কাজের ফিরিস্তি আর ছবি তোলায় আলোর ব্যবহার নিয়ে বর্ণনা দিয়ে ক্যারিশমা দেখাত। লাঞ্চ শেষে চা-পর্বটুকু সেরে মৌরি যখন মুঠোফোনে আমাদের সেলফি তুলত তখনো তার কাঁধে ব্র্যান্ডের চড়া ফিতায় প্রফেশনাল ক্যামেরাটা ঝুলে থাকত। সেলফি ফ্রেমে আমি, মৌরি, বর্ণা আর ফটোগ্রাফারের (যার নাম আমি কখনোই বলতে চাই না) মুখ ঠাসাঠাসি করতে করতে মনে হতো আমাদের ব্যক্তিগত একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা থাকতেই পারত। আমি তখন ওই হাউসের মিডিয়া সেকশনে কাজ করি।
মৌরির ঠিক বিপরীতটাই ছিল বর্ণা, ওই অফিসের পোস্ট প্রডাকশন ইনচার্জ। ওর বড় ফ্রেম আর মোটা কাচের চশমার ভেতর চোখ দুটো ছিল স্বল্পজলে ভাসানো কাগজের নৌকার মতো সদা টলায়মান। কখনো কখনো বর্ণার মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে আমাকে ওর চোখ খোলার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু এই অভিব্যক্তি প্রতিনিয়ত এতটাই বদলাত যে, কম্পিউটারের জটিল পাসওয়ার্ডের মতো ভয় হতো- না আবার ভুল হয়ে যাই। যেভাবে ভয়ে কী-বোর্ডটার ওপর চোখ দিয়ে রাখি আর ভাবি- হায় খোদা, পরের অক্ষরটা যেন মিলে যায়। মৌরি যখন ফটোগ্রাফারের সঙ্গে চুটিয়ে সম্পর্ক করছে (অবশ্য তা সে বরাবরই অস্বীকার করত), তখন আমি বর্ণার সঙ্গে অমীমাংসিতভাবে মিশি।
মৌরি হাসনাত এসেছিল চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীর মোহনা পার হয়ে। যেখানে প্রতি বছর বর্ষায় লঞ্চডুবিতে বিপুল প্রাণের মৃত্যুর ঘটনা ছিল মিডিয়ার আবেগ আর সহমর্মিতা আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। ডাকাতিয়া মোহনার বহু চোরাই স্রোতের অপ্রতিরোধ্য টান ছিল মৌরির ভেতর। ওর বিয়েটা ছিল পরিবার থেকে রীতিমতো আদায় করে নেয়ার ব্যাপার। ইতিহাস লুকিয়ে ফেলা প্রাচীন নগরীর মতো ওর বাম হাতের আধেক হারানোর কথা আমি কখনো জানতে পারিনি। নামের শেষে ‘হাসনাত’ শব্দটা কী করে যেন নদীর ওপারের মেয়েদের ক্ষেত্রেই বেশি শুনেছি, যেখানে শব্দের শেষের কণ্ঠের সুললিত জোর থাকত। শুদ্ধভাষী যশোরের বর্ণা ফেরদৌসী চৈতন্যহীন স্বর অবিনীত রকম ওঠানামা করত। তাই ঢাকায় এসে ও যে থিয়েটার বা আবৃত্তি সংগঠনে যোগ দিবে তা ছিল প্রায় পূর্বনির্ধারিত রকমের স্বাভাবিক। বরং ওইসব অনুষ্ঠানে আমাদের (আমি, মৌরি আর ফটোগ্রাফার) আমন্ত্রিত অতিথি ছিল সম্মানিত হওয়ার মতো ব্যাপার। তাহলেও বর্ণা আমাকেই কেবল স্টেজের পেছনের মেকআব রুমে নিয়ে যাওয়ার স্পর্ধা আর গুরুত্ব দেখাত।
মৌরির ৩২তম জন্মদিনে (চিরায়ত দুঃখের মতো দিনটা আমার প্রায় মনেই থাকে না) ওকে একটা পার্সোনাল ডিএসএলআর কিনে দিলাম। ও ছোট্ট করে বলল-‘এখনই আমাকে স্মৃতি করে রাখতে চাও।’ তারপর বিড়বিড় করল, ‘মানুষ তো স্মৃতির পাহাড়। রায় কুড়িয়ে বেল। মানুষ সারাজীবন সেই স্মৃতির পাহাড়ই বাইতে চায়।’
জানালা ধারে উদাস তাকিয়ে আছে মৌরি, ঝুল বারান্দায় বনসাইয়ে ডান হাত বোলাচ্ছে, বারান্দার গ্রিলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে কিংবা বাম হাতটা সামলে দরজার সামনে হেলে আছে এমন ভঙ্গিতে ওর বেশ কিছু ছবি তুললাম। তারপর ও ক্যামেরা চেয়ে নিল আমার ছবি তুলবে বলে, যা আমার জন্য সৌন্দর্যে চেয়ে ঐতিহাসিক মূল্য বেশি বহন করবে। আমি ওর কথারই পুনরাবৃত্তি করলাম-‘মরে যাইনি তো এখনো।’ ‘জীবিতরাই মৃতদের স্মৃতি বহন করে’-উত্তরে মৌরি বলল।
প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারের মতো, যা ও সেই ফটোগ্রাফারের কাছ থেকে শিখে এসেছিল, ডান হতে ধরা ক্যামেরাটা অজ্ঞাত স্মৃতিবাহী বাম হাতের বাহুতে ঠেকিয়ে আমাকে নিশানা করছিল। ক্যামেরার আই ফোকালে একবার চোখ রেখেই বলল-‘অন করে দাও।’ একটা গোপন অপমান লাঘব করার জন্য ওর কাটা হাতটার দিকে তাকাই। আমি দেখলাম ক্যামেরাটা তখন দিব্যি চালু আছে। তবু আমি নেড়েচেড়ে দিলাম। ও ভর দিয়ে একই কথা ফেরত দিল-‘অন করে দাও।’ আমার ধূর্ততা ধরা পড়ে গেল কি! শিশু বোঝানোর মতো আবার আমি নেড়েচেড়ে, অনেকটা মনোযোগ দিয়ে লেন্সটা একবার বড়-ছোট করে দেখলাম। ক্যামেরা বিষয়ে নিজের অজ্ঞতার কথা স্বীকার করেও যদি বলি, আসলে ক্যামেরায় কিছু করারই ছিল না আমার, বরং কখনো কখনো ওই ফটোগ্রাফারের মতো মুডটা পেয়ে বসে এ-ই যা। তারপর কয়েকবার ক্লিক করে ক্যামেরাটা ফিরিয়ে দিল বিরক্তিসহকারে। পরিত্যক্ত সরকারি প্রকল্পে ক্ষতির পরিমাণ হিসাব না করার মতো আমি ব্যাপারটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। একরাতে ক্যামেরটা বের করে ছবিগুলো রিভিউ করছিলাম যেন আমাদের বর্তমান বলে তেমন আনন্দের কিছু নেই। কিন্তু বিরক্তিভরে আবিষ্কার করলাম মৌরির তোলা একটা ছবিতেও ক্যামেরা পজিসন ঠিক ছিল না। হয়তো স্বল্প আলোর কারণে আমাকে ঠাওর করে উঠতে পারেনি। যেমন স্বল্প আলোয় মৌরি একদিন আমাকে আর বর্ণাকে সিনেমা হলের এক কোনায় অন্তরঙ্গ আবিষ্কার করেও ঠিক চিনতে পারেনি। কিন্তু মৌরি আর ফটোগ্রাফারকে আমি ঠিকই চিনেছিলাম পান্থপথের এক গলিতে। তখন প্রায়দিন সকালে মৌরির সঙ্গে আমি এক রিকশায় অফিসে যেতাম। কিন্তু মৌরি ফিরত ফটোগ্রাফারের সঙ্গে। আর কোনো কোনো দিন বর্ণার পরিচিত বায়িং হাউসে চাকরিজীবী বড় ভাই ও কবি (আমি প্রায়ই তাকে ‘কাক-বন্ধ্যা কবি’ বলে ভর্ৎসনা করতাম), না এলে অসংকোচে ওর সঙ্গে আমি বাসায় ফিরতাম। মৌরির এই ধারণা প্রায় জন্মে গিয়েছিল যে, রাজিয়া সুলতানা রোডে বর্ণার বাসা নেয়া ছিল নেহাত আমার কাছাকাছি থাকা। তারপর থেকে মৌরি কখনোই আমার সঙ্গে অফিসে যায়নি।
মৌরিকে নিয়ে যে ছোট্ট বাসায় উঠেছি সেটা পুরোনো ও স্যাঁতসেঁতে। ভেতরে সত্তর দশকের মোজাইক করা ফ্লোর আর দেয়ালে রাস্তার পুরোনো সোডিয়াম লাইটের মতো হলদেটে চুনকাম। তাতে লাইটের আলো অনেকটা শুষে নেয়। ঘরের বাতি বদলালে অল্পদিনের মধ্যে মনে হয় আলো কমে গেছে। এখন আর বাসাবাড়ির বাল্বে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, বিপণি বা কারখানার বেদম আলোর বাতি লাগাতে হবে। মৌরি প্রায়ই বাসার আলোকস্বল্পতার কথা বলে। আসলে বিয়ের পর নতুন করে আর বাসা খোঁজা হয়নি। আমার সঙ্গে যে দুজন চাকরিজীবী বয়সী ব্যাচেলর ছিলেন, তারা একে একে বিদায় হওয়ার পর সেই দুই রুমের বাসায় মৌরিকে তুলেছি। নিঃশ্বাস ফেলার মতো একটা জানালাসহ পাশের রুমটা আদতে আমাদের অবারিত যৌন উদ্যাপন ছাড়া ব্যবহার নেই। মৌরির অভিযোগহীন চোখের চাওয়া মোজাইকের ভেতর সাদা-কালো পাথরকুঁচির মতো অগণন অভিজাত্য নিয়ে একাকার হয়ে থাকে। কখনো আমরা ভাবি-অটোমোবাইলস শো রুমের মতো একপাশে বড় আয়না লগিয়ে দিলে রুমটা দ্বিগুণ করে ফেললে কেমন হয়। যদিও আয়নার ওপাশে কখনোই ভ্রমণ করা হবে না।
চশমার পাওয়ারের কারণেও তো চোখের পাপড়ি ঝরে যেতে পারে। শৈশবে আতস কাচের নিচে কাগজ রেখে আগুন জ্বালানোর অভিজ্ঞতা থেকেই এই মাহাত্ম্য মাথায় এসেছিল। কিন্তু হেলথ অ্যান্ড হোপ হসপিটালের লনে বসেও মৌরির সে বিষয়ে কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয়নি। কবিতায় পারদর্শিতা দেখানো এই হসপিটালের এক ডাক্তার আমার পরিচিত। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সমস্যার নিগূঢ় অন্বেষী ডাক্তার সদা চিন্তামগ্ন চেহারায় জানালেন, মৌরি আসলে বাম চোখে দেখেই না। এমনকি তা হতে পারে জন্মের পর থেকেই। তারপর তার নিজস্ব রসবোধ থেকে নানা গল্প, এমনকি তার মধ্যে দু-একটা খুবই চমকদার, শুনিয়ে বিষয়টাকে হালকা ও দুঃখহীন গুরুত্ব বন্দি করতে চাইছিলেন সেই ডাক্তার। কিন্তু জন্মের পর থেকেই কেউ এক চোখে দেখে না, অথচ তা জানতে পারছে ৩২ বছরে এসে!-মৌরির সুকঠিন উদাসীনতা আমাকে বিহ্বল করে। যথারীতি মৌরি বিষয়টাকে খুব আমলে না নিয়ে বলল-তাহলে তো আর কোনো সমস্যা নেই। ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠা সিকিউরিটির কোডের মতো জটিল হয়ে উঠছে ওর মন। একসময় হাতের আন্দাজেও চাবিতে খুলে যাওয়া তালার মতো সহজে আর কিছুই খুলছে না। কখনো সে আমলেই নিত না-ও বাম চোখে কিছুই দেখে না। একবার তো শব্দ শুনে বাম পাশে একটা মশা মারতে গিয়ে চেয়ার থেকে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। তখন মনে হলো, কিছুদিন বাড়তি পরিচ্ছন্নতা নিয়ে রিকশায় (কেন যেন অবধারিতভাবে) মৌরির বাম পাশে বসে যখন অফিসে গেছি, তখন ও আমাকে খেয়ালই করেনি। সে কারণেই হয়তো অফিসের বিবাহিত ফটোগ্রাফারের সঙ্গে জড়াতে দ্বিধা করেনি। তখন অবশ্য মৌরিও বিবাহিত ছিল। কখনো সে বেদম উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বয়ফ্রেন্ড তথা স্বামীর আর নিজের কথা বর্ধিষ্ণু সুখ মিশিয়ে এত বলত যে, খুব সহজ রোমাঞ্চ ছিল তাকে বলা-তোমার মতো মেয়ে পেলে আমিও জীবনসঙ্গী করতাম। ওর সাবেক সহপাঠী থেকে স্বামী বনে যাওয়া ছেলেটা কানাডা নাকি অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। এই তথ্যটুকু ছাড়া কোথাও তার ছাপ ছিল না। শুধু সেদিনই বুঝলাম, যখন জানলাম ছেলেটার বহুগামিতার জন্য ওদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। হতে পারে, ফটোগ্রাফারের সঙ্গে ওর সম্পর্কের কারণেই আমরা তা বুঝতে পারিনি। শুনেছি প্রথমে মৌরি, তারপর ফটোগ্রাফার ছোকরাটা চাকরি ছেড়ে কী এক স্টুডিও করে গার্মেন্ট প্রোডাক্টের অনলাইন শপ চালু করে ছিল। তত দিনে আমি হাউস বদলেছি।
শ্রেষ্ঠ কবিতা নির্বাচনের মতো ফেলে দেয়া অজস্র কবিতা থেকে তুলে আনা স্মৃতির মতো বলতে পারি, বর্ণা আমাকে ডাকত ‘এছো বেব’ বলে। ওর কণ্ঠে সুললিত শোনা শব্দটা আমাকে এতটা পুলকিত করেছিল যে, ওকে বলার পর আর সহগামী আরেক শব্দ তৈরি করতে গিয়েও আমি পারিনি। মাস ছয়েক আগে বর্ণার সঙ্গে দেখা হলে এসব বিষয় নিয়েই আলাপ হলো। মৌরির চোখের কথা বললাম। বললাম ওর নির্মম উদাসীনতার খবর। বর্ণার ধারণা, ডিভোর্সের পর ফটোগ্রাফারের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার পরই এমনটা শুরু। পারিবারিক কারণেই ফটোগ্রাফারের উপায় ছিল না সম্পর্ক রাখার। বোঝা গেল, আমার সঙ্গে মৌরির অতর্কিত বিয়েটাকেও সন্দেহ করে বর্ণা। ওর ধারণা, আমরা একজন অপরজনকে কায়দা করে বিছানায় নিয়ে বাগিয়ে নিয়েছি। যেহেতু বর্ণা আমার বিধ্বংসী যৌনাকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে খানিকটা অবগত ছিল। কিন্তু মৌরি কী করে তার বাম হাতটা হারিয়ে ছিল তা সেই একেবারেই জানে না। শুধু এই ইঙ্গিত দিয়ে এ পর্ব শেষ হয় যে, ছন্নছাড়া জীবনের জন্য খানিকটা আভিজাত্যে ভোগা মৌরির পরিবার তাকেই দায়ী করেছে; এমনকি তাকে কখনোই গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। আর এ-ও সত্য, জৈবিক জীবনে তত দিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়া মৌরির পরিবারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার জন্য হলেও একটা আশ্রয় দরকার ছিল। একইভাবে ওকে অর্জনের অবদমিত ইচ্ছার একটা পরিণতি দরকার ছিল আমার। মৌরির জন্য একটু দুঃখ রেখেই বলতে পারি-হাত হারানোর পরই তা সম্ভব হয়েছে। বর্ণাকে পেয়ে আমার নতুন অভিযান সম্পর্কে বিস্তর আলাপ করা গেল-আমি মৌরির জন্য একটা শো করার চেষ্টা করছি।
সে রাতে বাসায় ফেরার পর মৌরি প্রায় তাড়-স্বরে চিৎকার করে উঠল-আমি বাসায় ফিরতে দেরি করি কেন? মিইয়ে যাওয়া স্বরে বলল-আমার একা থাকতে কষ্ট হয়। সমুদ্রে ভাসমান শৈলচূড়ার মতো সংসারের অনিবার্য নিয়মে গোপন রেখে আমি ভেতরে ভেতরে চেষ্টা করছিলাম মৌরির জন্য কিছু করার। বিয়ের পর বাসায় বসেই ও পরিচিত কিছু ফ্যাশন হাউসের জন্য ডিজাইন করত। আমি চাইছিলাম ওর ডান হাতে ভর করেই একটা ছোট্ট শো-রুম দাঁড়িয়ে যাক। এর সঙ্গে বর্ণাকেও যুক্ত করা যেতে পারে, হতে পারে তা ছিল আমার পক্ষপাতদুষ্টু ভাবনা। কিন্তু লেখাজোখা ছেড়ে পাঠের আনন্দে মশগুল এক বয়স্ক লেখকের মতো কেবল যাপনের আনন্দটুকু নিতে চায় মৌরি। চাবি হারানো পুরোনো সিন্দুকের মতো ওর ভেতরটা আমরা কেউ-ই দেখতে পারিনি।
‘এক এক্স-কলিগের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।’-নাম আড়াল করেই কেবল বললাম আমি। বাকি কথা তোলার আগেই-‘নিশ্চয়ই বর্ণার সঙ্গে!’-বলল মৌরি। ‘হুম’-প্রস্তুতিহীনভাবে আমি বললাম। ‘ওর সঙ্গে দেখা করতে গেলে কেন?’-ভীষণ খেপে গেল মৌরি। অভিধানগুলোয় শব্দের বিকৃতি পর্যন্ত উল্লেখ করে দেয়ার মতো মৌরির রাগও ছিল আমার কাছে একটা পূর্বনির্ধারিত ব্যাপার। কিন্তু ও চিৎকার করতে করতে ডান হাতে ধরা কাঁটা চামচটা নিজের বাম হাতের চেটোহীন কব্জিতে বসিয়ে দিল। তারপর নিজের হাতটাকে ঠিক ফালা-ফালা বলতে যা বোঝায়, তা করতে করতে চিৎকার করতে লাগল-‘এই হাতটা ধরেছিলে ওর, নাহ্, এই হাতটা।’ মৌরিকে এ রকম খেপে যেতে আমি কখনোই দেখিনি। আসলে পাথরচাপা ঘাসের মতো ওর হৃদয় ছিল নরম আর ফ্যাকাশে। আমি হাতটা চেপে ধরতেই ও কল্লোলিনী কান্না জুড়ে দিল। মনে আছে, সেবারই টানা তিন দিন দায়িত্বে সঙ্গে মৌরির বিছানার পাশে কাটালাম।
ডাক্তাররা আশঙ্কা করছিল ক্ষত জায়গায় ইনফেকশন হয়ে যায় কিনা। কিন্তু সব আশঙ্কা মিথ্যে করে দেয়ার মতো কিছুই ঘটল না। ইনফেকশনের কারণে কনুইয়ের খানিক নিচ থেকে কেটে ফেলতে হলো। তারপরের সবকিছু যেন দ্রুত আর খাটো হয়ে আসছিল, কিন্তু অদূর প্রসারি ছিল না কিছুই। এর ঠিক দশ মাস পরে মৌরিকে নিয়ে আবার হাসপাতালে এসেছিলাম প্রথম সন্তান প্রসবের জন্য। এ নিয়ে মৌরির ভেতরে খানিকটা তাড়া ছিল। প্রচণ্ড প্রসব ব্যথার ভেতরও হাতপাতালের বেডে শুয়ে মৌরি মুখ বল্টে জানাল-সে চায় সিজার না করেই সন্তান জন্ম নিক। কিন্তু সন্তান জন্মের পর ওর কি ধারণা আমি আরো বেশি ঘরমুখো হব? আমাদের কোনো ইচ্ছেই ছিল না সন্তান নেয়ার, যদিও একমাত্র জানালা দেয়া পাশের রুমটায় অদম্যভাবেই পরস্পর মিলেছি। যেহেতু মৌরির সঙ্গে সেই ফটোগ্রাফারের কোনো যোগাযোগ নেই, সন্তান ওকে বাসায় একা থাকার যন্ত্রণা লাঘব করবে বলেই মেনেও নিয়েছিলাম। মৌরির ধারণা কিংবা নারীরা যেভাবে স্বামীকে উপস্থান করে তেমনি, স্বামী বলেই আমি ভালো মানুষ। কোনো কোনো দিন বাসা থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে শ্লেষ দিয়ে বলত-যেখানেই যাও, দায়িত্ব মনে করেই ফিরে এসো।
মৌরি ভুলেই গিয়েছিল ওর পাগলামি আগে থেকে অনেক বেড়েছে। একটা কিছু হলেই শিশুদের কান্না ছিল নিয়তি। তখন আমার চুপ করে যাওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকত না। তার পরও সুযোগ পেলে আমি যেন হারিয়ে যেতাম। অফিস থেকে ফেরার পথে বর্ণার সঙ্গে দেখা করাটা ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। বর্ণার সব চেয়ে সহানুভূতির জন্য কখনোই আমার অসহায়ত্বের মিথ্যে বর্ণনা দিতে হয়নি।
আমাকে আরো বন্দি করা বা দূরে ঠেলে দেয়ার জন্যই কিনা মৌরি দ্রুতই আরেকটা সন্তান নিল। পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি দেখার করুণ চোখগুলো ছাড়া মৌরির কোনো গোপন প্রেমিক নেই বলেই জানি। ফটোগ্রাফির অধিক প্রদর্শনকারী মৌরির সাবেক সহকর্মীকে ফটোগ্রাফারকে ক্ষমা করতাম সে নিজেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল বলে। নিজেকে সরিয়ে রাখায় অসহায়ত্ব ও সাবধানতার ভেতর আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে ওর প্রসবের দিন ঘনিয়ে আসতে থাকে। ঠোঁট কামড়ে সেবার জীবন বিপন্ন করে দিচ্ছিল, তবু সিজার নিল না। এটা ঠিক, শিশুদের জন্য হলেও আমাকে সংসারের সময় দিতে হচ্ছিল। পরের বছর আরো একটা সন্তানের জন্ম দিল নাকে-মুখে প্রায় রক্ত তোলে। সন্ধ্যার পর বাসায় কান্নার হাট বসে যেত। পাশের রুমে থাকা আমার পাকাপাকি হয়ে গেল। আগে এক রুমে একা থাকার বদলে এখন দুই রুমে একা থাকা আরকি। মৌরির সঙ্গে কথা হয় অনূদিত গল্পের শেষে অনুবাদের উৎস দেয়ার মতো। আর কোনো কোনো রাতে মৌরির সঙ্গে মিলিত হই অকর্মণ্য কাঠুরের মতো যার দৈনিকের লাকড়ি জোগাড় করা ছাড়া সন্তুষ্ট থাকার কিছুই নেই, পুরো গাছ কেটে জায়গা সাফ করার চিন্তা তার কাছে কেবল বাতুলতাই নয়, অমূলকও। তবে একটু সচেতন থাকতে হয়, সহসাই যেন মরমর করে গাছটা আমাদের ওপরে না পড়ে। সঙ্গম শেষে বাড়িওয়ালার লাগিয়ে দেয়া পুরোনো ফ্যানটা, যা এখনো বদলের মনোযোগ দিইনি, তা বন্ধ করলে বোঝা যেত-ঘরটা আসলে কতটা নৈঃশব্দ্যে ডুবেছে। তারপর জলদেবী ফেরিয়ে দেবেন না নিশ্চিত জেনে জলে কুঠার হারানো কাঠুরের মতো আমরা পরস্পরের দিকে ব্যথাতুরভাবে তাকিয়ে থাকি কিছুক্ষণ।
পার্ক কিংবা রেস্টুরেন্টে বর্ণা ফেরদৌসীর দিকেও আজকাল ব্যথাতুরভাবে তাকাই। ছোট বোনটা নিজ দায়িত্বে বিয়ে দেয়ার পর বর্ণা একেবারে নির্ভার হয়ে গেছে। ও কখনো-সখনো পার্কে অপেক্ষা করে থাকে। মুখফুটে তেমন কথা না বলেও আমরা অনেকক্ষণ বসে থাকতে পারতাম। দীর্ঘক্ষণ বাইরের থাকার এটাই জায়গা বলা যেতে পারে। এ-ও সত্য যে, আমি প্রথম থেকেই মৌরির সঙ্গ প্রত্যাশী ছিলাম। কিন্তু ওর অনপেক্ষ উপেক্ষা ভাষাহীনভাবে বুকের ভেতর চাবুক ছোটাত। ফিরিয়ে দেবে নিশ্চিত জেনেও ওকে দুপুরের আহারে আহ্বান জানাতে আমার উত্তেজনার কমতি ছিল না। আমার পছন্দের ওর দীর্ঘ চুলগুলো তাকের ওপর সাজানো বুদ্ধের মূর্তির মতো মুগ্ধতা ছড়াত। কখনো কখনো মৌরির মতো পিঠ অব্দি হেয়ার কাটিংয়ে নাতিদীর্ঘ চুল বর্ণাকে আরো নান্দনিক করে তুলত। তবে সাহিত্যসুলভ বিক্ষত তরুণ হরিণীর মতো ওকে সব সময় দাবড়ে বেড়াত।
দুর্বোধ্যতার ভেতর গত তিন বছরে ঠিক যে দিন মৌরি তিনটি সন্তান জন্ম দিয়েছে, সে দিনটি ঘনিয়ে আসতেই আমার ভেতরে অনন্যোপায় পরাজয়ের শঙ্কা লতিয়ে ওঠে। চতুর্থ বছরের সেই দিন বাসায় ফিরে দেখি মৌরি যন্ত্রণায় প্রায় চিৎকার করছে। আমি চোখ গোল করতে করতে ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার বলল, বাম হাতের ইনফেকশনটা একেবারে হাড়ে ধরে গেছে। এবার তার কনুই বরাবর না কাটলেই নয়। মৌরি যেন ভেতর ভেতর তৈরি হয়েই ছিল। আমার কপালের ভাঁজ নামিয়ে দিয়ে গুমড়ে গুমড়ে যা বলল তাতে চোখ কপালে উঠে যাওয়ার জো-হাতটা কাটার সময় যেন সেন্স রাখা হয়। তখনো মনে হলো, হাত হারালেও ও যেন খুশি নিজেকে বিলিয়ে দিতে পেরে। মৌরির এসব পাগলামি আমাকে আরো বেশি উদাসীন করে দিচ্ছিল সবকিছু থেকে। আমি দ্রুতই শো-রুম নেয়ার ব্যাপারে উদ্যোগী হই। একটা কাজের সূচনা হয়তো ওকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবে। বর্ণার ওপর গোছগাছের অনেক বেশি ভার দিয়ে রেখেছি, সে-ই যা স্বস্তি।
হাত কাটার পর এক রাতে মৌরি আবার চিৎকার করে উঠল-তার বাম হাতের মাংস পেশিতে খিঁচুনি হচ্ছে। আমাকে কব্জিটা চেপে ধরতে বলল। আঙুলগুলো নাকি ব্যথায় কালিয়ে নিচ্ছে। আমাকে একটা একটা করে আঙুলের গিঁট ফুটিয়ে দিতে বলল। অথচ কনুইয়ের নিচ থেকে ওর হাতাটা কেটে ফেলা হয়েছে। আমাকে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ও আরো চিৎকার করে উঠল-‘কী হলো, দিচ্ছ না কেন? আমার বৃদ্ধাঙুলটা কর্কট কামড়ে নিচ্ছে, কেনি আঙুলে মস্ত ডাই কামড়ে ধরেছে, মাঝের আঙুলে কে যেন সুঁই বিঁধিয়ে দিচ্ছে। হাতের ভেতর ইঁদুর মারা ছাটকলটা আটকে আছে। তুমি একটা একটা করে ছাড়াও, একটু ম্যাসাজ করে দাও। হাতটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। টিকটিকির লেজের মতো খসে পড়বে তো, তুমি ধরো।’ চোখ বন্ধ করে চিৎকার করছিল আর কাতরাচ্ছিল মৌরি। আমি সুনিপুণ অভিনেতার মতো ম্যাসাজ করে যাচ্ছি শূন্য হাতে আর অন্ধ হোমারের ‘ওডিসি’র মতো ওর হাতের বর্নণা দিয়ে যাচ্ছিলাম। ও কোঁকানি খানিকটা কমে আসতেই কবিতায় পারদর্শিতা দেখানো পরিচিত ডাক্তারের কথা মনে হলো। মৌরিকে চোখ দেখানের দিনই সে ফানথম লিব আর রামচন্দ্রের আয়নার কথা বলছিলেন। ড. ভি এস রামচন্দ্র নামের এক ডাক্তার নাকি কেটে ফেলা অঙ্গের স্থানে ব্যথায় কাঁতরানো রোগীকে তিনি এই থেরাপি দিতেন। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি দুলে উঠল-আচ্ছা, ওকে ডান হাতটা আয়নায় দেখালে কেমন হয়? চট করে বাথরুমের আট বাই বারো ইঞ্চি আয়নাটা এনে মৌরির বাম পাশে ধরে বললাম-‘কোথায়, তোমার হাতটা তো ঠিকই আছে।’ বামপাশে ধরা আয়নায় ওর ডান হাতটা অবিকল বাম হাতের মতো দেখাচ্ছিল। বিহ্বল আর অবিশ্বাস ভরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আয়নায় সেই হাতটাই দেখছিল। মায়ার মূর্তি ভেঙে আঙুলগুলো নাড়িয়ে দেখছিল, উল্টেপাল্টে দেখছিল চোট। বিস্ময় আর খুশি নিয়ে মাঝরাত পেরিয়েও মৌরি হাতটাকে দেখল। তারপর আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল।
কিন্তু পরদিন সকালে ঘুম ভাঙলো মৌরির চিৎকারে-‘বাথরুম এত ছোট কেন…’। আট বছর ধরে তো আমরা এই বাথরুম ব্যবহার করছি, কোনো দিন তো এমনটা বলেনি! মৌরি বেসিনে হাত-মুখ ধুতে ধুতে কাঁদছিল। কিন্তু বাথরুমে গিয়ে আমি কোনো বদল দেখলাম না, শুধু রাতে মৌরিকে আয়না দেখানোর পর রাখতে গিয়ে ভেঙে যাওয়ায় আয়না শূন্য দেয়ালে ছোট্ট একটা শামুক খুব ধীরে ওপরে দিকে উঠে যাচ্ছে। কিছুতেই মৌরির কান্না থামছিল না-‘এতটুকু বাথরুমে মানুষ মুখ ধোয় কী করে!’ অফিস থেকে ফেরার পথে আয়না আনার প্রতিশ্রুতিতে কোনো মতে মৌরিকে রুমে ফেরানো গেল। পরে বেসিনে মুখ ধুতে গিয়ে আমারও মনে হলো-সত্যি, বাথরুমটা বেশ ছোট ছোট লাগছে। তার চেয়ে বড় কথা, বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নার দিকে চোখ দিতেই রুমটা দ্বিগুণ হয়ে যেত। যদিও আয়না দেখে ওই বর্ধিত রুমে আমাদের কোনো দিনই যাওয়া হয়নি।
আয়না ভাঙার পর মৌরি বাথরুমে যেতেই ভয় পেতে শুরু করল। ওর ধারণা, বাথরুমে কোনো আলো নেই। ওই ঘরে একবার আটকে গেলে আর বের হতে পারবে না। অনেকবার আলো জ্বেলে দেখিয়েছি, তবু ওর ভয় কাটতে চায় না। মাঝেমধ্যে ওর শূন্য বাহুতে চিনচিনিয়ে ব্যথা অনুভবের কথা বলে। এবার একটা হাত-আয়না এনে দেয়ার কথা ভাবছিলাম, যাতে ও সব সময়ই দুটো হাত দেখতে পারে। বর্ণাও বিষয়টায় সায় দিল। বর্ণাকে নিয়ে নতুন শো-রুমের জন্য এটা-সেটা কেনাকাটা করতে করতেই মৌরির জন্য পেছনে ধরা যায় এমন একটা হাতওয়ালা আয়না কিনে নিলাম। কিন্তু মৌরিকে তা দিয়ে ঘটল আরেক ঘটনা। ওর যেহেতু বাম হাতই ছিল না, তাই ডান হাতে ধরতে হতো আয়নাটাকে। আর ডান হাতে আয়না ধরে তো বাম হাতের কাটা অংশটাই দেখা যাবে। ওহ্, এত্ত বড় ভুল! আমার তখনই খেয়াল হলো, আয়নাটা তাকে বাম হাতেই ধরতে হবে। নয়তো হাত-আয়নায় মৌরি দেখবে দুই হাতই নেই। মৌরি তা দেখে এবার যেন ঠিক চুপে গেল। তবু কর্তৃত্বাধীন কিছু পছন্দ করার মতো অবহেলা ছিল ওর চাহনীতে। আমার প্রতি ভালোবাসা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় আমি সব সময়ই অনুভব করতাম। আমাকে সে কাঁহাতক ভালোই বেসেছিল ভেবে ভেবে ওর স্মৃতির প্রতি অঞ্জলি জাগাই।
এই ভালোবাসা, আয়নাবাজি কিংবা প্রতারণার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মৌরি আবার সন্তান নেয়ার অঙ্ক কষতে শুরু করেছে। ভালোবাসা আর প্রতিশোধ-এ দুটোই মানুষের মাথা বিগড়ে দেয়। কিন্তু মৌরির ক্ষেত্রে এটা কেবল প্রতিশোধ নয়, নিজেকে চূড়ান্ত রকম শেষ করে দেয়া। ও এর শেষটাই দেখতে চায়। চতুর্থ সন্তানটি প্রসবের সময়ও মৌরি প্রায় দম ঠেকিয়ে বলছিল-দয়া করে সিজার করবেন না। আমার সকারণ ভয় হচ্ছিল, এর ফলে নিত্যনবায়িত নরক-নিসর্গটা ওর নাগালের বাইরে না চলে যায়। যদিও ভবিষ্যৎ ক্ষতি আর পূর্বনির্ধারিত সমাধান চিন্তা করে শো-রুমের দায়িত্বটা বর্ণাকে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছি।
অলাত এহ্সান: গল্পকার। প্রকাশিত গ্রন্থ: অনভ্যাসের দিনে; বৃদ্ধাশ্রম হয়ে উঠা কফি হাউজটি।