শওকত আলী রতন

বহতা নদীর মতোই মানুষের জীবন! নদী যেমন নিরবধি ছুটে চলে অনন্তের পথে; তেমনি মানুষের জীবিকার জন্য ছুটে চলতে হয় এক স্থান থেকে অন্যস্থানে। জীবিকার জন্য তাল মিলিয়ে চলতে হয় বছরের পর বছর। বলছি, ৪’শত বছরের পুরনো বসতি ঢাকার দোহার উপজেলার করিমগঞ্জ এলাকার সওদাগর সম্প্রদায়ের কথা! করিমগঞ্জ এলাকার মানুষের বৈচিত্র্যময় এক পেশা! এই সম্প্রদায়ের মানুষ  জীবিকার […]

বহতা নদীর মতোই মানুষের জীবন! নদী যেমন নিরবধি ছুটে চলে অনন্তের পথে; তেমনি মানুষের জীবিকার জন্য ছুটে চলতে হয় এক স্থান থেকে অন্যস্থানে। জীবিকার জন্য তাল মিলিয়ে চলতে হয় বছরের পর বছর। বলছি, ৪’শত বছরের পুরনো বসতি ঢাকার দোহার উপজেলার করিমগঞ্জ এলাকার সওদাগর সম্প্রদায়ের কথা! করিমগঞ্জ এলাকার মানুষের বৈচিত্র্যময় এক পেশা! এই সম্প্রদায়ের মানুষ  জীবিকার জন্য গ্রামীণ মেলাকে বেছে নিয়েছেন শুরু থেকেই। গ্রামীণ মেলায় হরেক রকম পণ্যের সমাহার নিয়ে হাজির হয়ে থাকেন মেলাগুলোতে। বছরের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি কাটে মেলায় মেলায়। গ্রামীণ মেলায় রকমারি পণ্যের দেখা মিলে এ পল্লীর মানুষের কল্যাণে।  মেলা চলাকালীন নাওয়া, খাওয়া আর ঘুম সবই চলে এই মেলায়! 

জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ৪’শত বছর আগে সলমত মুন্সী নামে এক ব্যক্তি ব্যবসা বাণিজ্যের উদেশ্যে বর্তমান জামালপুর জেলা থেকে পানসি নৌকায় করে  ঢাকার দোহার উপজেলার করিমগঞ্জ এলাকায় এসেছিলেন। এখানে আসার পর তিনি পানসি নৌকায় করে ঘুরে ঘুরে কাপড়, চুরি, ফিতা, মসলা ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি করতেন। এখানকার আলো বাতাস আর মানুষের ভালোবাসার কারণে সলমত মুন্সী তিনি আর জামালপুরে  ফিরে না গিয়ে এখানেই থেকে জীবন যাপন শুরু করেন। মূলত সলমত মুন্সী কমিরগঞ্জ এলাকায় প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বসতি গড়েন। তাঁর মাধ্যমেই  বসবাসের গোড়াপত্তন হয়েছিল করিমগঞ্জে।

 সলমত মুন্সী র্দীঘ হায়াত লাভ করেছিলেন; ১২৫ বছর  বেঁচে ছিলেন। তিনি আল্লাহভীরু ও জ্ঞানী মানুষ ছিলেন এবং নামাজ রোজার প্রতি ছিল তাঁর অন্যরকম ভক্তি শ্রদ্ধা। তিনি প্রথম এখানে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বলে জানা যায় তাঁর বংশধরদের মধ্য থেকে।  তিনি ১৭২৯ সালে করিমগঞ্জে  প্রতিষ্ঠিত করেন একটি মসজিদ ও কবরস্থান। নির্মিত মসজিদের ইমামতি করেন। সে সময়ে তিনি পবিত্র হজ্ব পালনও করেন বলে জানা যায়। সলমত মুন্সীর দেখাদেখি আরো কিছু পরিবার বিভিন্ন এলাকা থেকে করিমগঞ্জ এলাকায় এসে ভাসমান নৌকায়  করে ব্যবসা বানিজ্য করে জীবিকা নির্বাহ করতো। পরবর্তীতে নৌকায় বসবাস ছেড়ে দিয়ে  স্থায়ীভাবে ভিটে-মাটিতে বসতি গড়ে তুলেন । শুরু থেকেই ব্যবসা বাণিজ্য করতো বলে বর্তমান এই করিমগঞ্জ পল্লী সওদাগর নামেই পরিচিত ছিল। তবে এই পল্লীর  হান্দারপাড়া নামেও পরিচিতি রয়েছে। দোহারের ঐহিত্যবাহী হাতে বুনানো লুঙ্গি তৈরিতে ব্যবহৃত  সানা তৈরি করত করিমগঞ্জ এই পল্লীর মানুষজন। এজন্য সানা থেকে হান্দার নামটি এসেছে বলে জানা যায়। এছাড়া এই পল্লীর মানুষজন ছাতা মেরামত, তালা চাবির কাজও করে থাকেন। এক সময়ে নারীরা গ্রামের গ্রামে গিয়ে চুড়ি- ফিতা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি করতো। 

 সময়ের ব্যবধানে করিমগঞ্জে বর্তমানে ১২৬টি পরিবারের বসবাস। আদি পেশা  ধরে রেখে নিজেদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সর্ম্পক গড়ে তুলে বসবাস করছেন সবাই।  ঢাকার দোহার উপজেলার লটাখোলা-বাহ্রা সড়কের পাশে অবস্থিত  করিমগঞ্জ এলাকাটি। রাস্তার পাশে কুঁড়ে ঘরের মধ্যে বসবাস অধিকাংশ পরিবারের। জীর্ণ শীর্ণভাবে এরা বসবাস করে আসছে যুগ যুগ ধরে।  দীর্ঘদিনেও এদের জীবন ধারায় তেমন কোন পরিবর্তন আসেনি। তবে খেয়ে পড়ে দিন চলে যাচ্ছে এই  পল্লীর মানুষজনের। তবে কয়েকটি পরিবারের আর্থিক অবস্থা উন্নতির ফলে জীবন যাত্রায় এসেছে ভিন্নতা।

 দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলার গ্রামীণ মেলাগুলো একদিকে যেমন প্রাচীন অন্যদিকে ব্যাপক  লোক সমাগম হয়ে থাকে। মেলাগুলিতে বেশ বিক্রি হয়ে থাকে বলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়ে থাকে বিক্রেতারা। মেলায় ব্যবসা বানিজ্য করে অনেক পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে।  বছরের নভেম্বর মাস থেকে জুন পর্যন্ত এই প্রায় ৭ মাস বেচাকেনার জন্য মেলায় মেলায় কাটাতে হয় তাদের। কোনো মেলায় ৭ দিন , কোনো মেলায় ১৫ দিন আবার কোনো কোনো মেলা ১দিন অবস্থান করতে হয় মেলা প্রাঙগনে। এই অঞ্চলের অধিকাংশ মেলাই সাধু সন্ন্যাসীর নামে হয়ে থাকে, তাই মেলাগুলো সাধুর মেলা নামে পরিচিত। দোহার উপজেলার নুরুল্লাহপুর শানাল শাহ্ চিশতির মেলা খুবই প্রসিদ্ধ।  এ মেলায় প্রতি বছর  দেশ বিদেশ থেকে সাধু সন্ন্যসী ও ভক্ত অনুরাগীদের আগমন ঘটে থাকে। ১৫দিন ব্যাপী  মেলা চলার কারণে বেচাবিক্রিও উল্লেখযোগ্য। যে কারণে প্রতিবছর এই দোকাদিনের কাছে এ মেলার গুরুত্ব অনেক। এজন্য মেলার কয়েক দিন আগে থেকেই বাঁশের খুঁটি আর টিন দিয়ে অস্থায়ী ঘর তুলে নিজেদের আয়ত্নে রাখেন।    

 এক  মেলা থেকে আরেক মেলার জন্য ছুটে চলতে হয় নিয়মানুসারে। এ কাজটি খুব সহজ নয়; মালামাল ভালোভাবে গুছগাছ করে  বাক্সবন্দী করে একস্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে চলা এ সবই জীবনের চাঁকা সচল রাখার এক অন্যরকম আয়োজন। একরকম যাযাবরের মতোই জীবন এদের! 

নবাবগঞ্জ উপজেলার গালিমপুর এলাকায় হযরত আফাসার (র:) ওরস উপলক্ষে ৪দিন ব্যাপী মেলায় আয়োজন হয়ে থাকে প্রতিবছর। পৌষের ১০ তারিখ থেকে  বাৎসরিক ওরসে আয়োজন উপলক্ষে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ে এ মেলাতে। 

গ্রামীণ মেলায় রকমারি জিনিসপত্র নিয়ে সময়মতো হাজির হওয়া দোকানিদের মধ্যে করিমগঞ্জ এলাকার মানুষজন নানা পণ্যের পসরা সাজান মেলায় । শিশুদের রকমারি  শিশু খেলনা  থেকে শুরু করে ঘর গৃহস্থালীর নানা ধরনের সামগ্রীর পসরা গ্রামীণ মেলার বিশেষ আকর্ষণ। মেলায় শিশুদের আকৃষ্ট করতে চকমপ্রদ জিনিসপত্রের ব্যাপক সমাহার শিশু খেলনার তালিকায়। চোখ ধাঁধানো সব খেলনার সমাহারের মধ্যে রয়েছে; খেলনা পিস্তল, বন্দুক, মুখোশ, বেলুন, বাঁশি, চরকি, গেমস, জিপগাড়ি, ট্রেন, জো জো গাড়ী, টমটম গাড়ী, বাস, রান্নার  খেলনা সেট সহ প্রতি বছরই এ তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন সব খেলনা  যা মেলায় আগত দর্শনার্থীদের বাড়তি নজর কাঁড়ে এমনিতেই। এসব খেলনার ব্যবহারে মেলা প্রাঙ্গন হয়ে উঠে প্রাণবন্ত! নানা বয়সের মানুষের ভিড় চোখে পড়ে মেলায়। তবে সময়ের ব্যবধানে মেলার পণ্য সামগ্রী এসেছে অনেক পরিবর্তন। আগের দিনের তুলনায় এখন ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্র যুক্ত হয়েছে। মেলায় যে রকমারি জিনিসপত্র  অধিকাংশ আসে এই করিমগঞ্জের দোকানিদের হাত ধরে। দক্ষিণ শিমুলিয়া বটতলা এলাকায় বাৎসরিক ওরসের মেলায় কথা হয় করিমগঞ্জের সাহাবুদ্দিন সাথে। তিনি এ মেলার মেয়েদের সাজ সজ্জার সব জিনিসপত্র নিয়ে মেলায় হাজির হয়েছিলেন। ৪০ বছর ধরে তিনি  মেলায় অস্থায়ী দোকান বসিয়ে বেচাকিনি করছেন। তাঁর বাবা মায়ের হাত ধরেই এ পেশায় আসেন সাহাবুদ্দিন। বাবা মায়ের মৃত্যুর পর তিনি এখন হাল ধরেছেন পুরনো এ পেশায়। সময়ের ব্যবধানের মেলায়  সাহাবুদ্দিনের সঙ্গী হয়েছে স্ত্রী ও সন্তানেরা। সময় ভাগাভাগি করে মেলায়  বেচাবিক্রি করে থাকেন এ পরিবারটি। তিনি জানান, নভেম্বর মাসে ১৬টি মেলায়  দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অংশ নিয়েছেন তিনি। টানা ৭ মাস তিনি ৪টি উপজেলার মোট ১২০টির মতো মেলা করে থাকেন। এ সময় অত্যন্ত ব্যস্ত সময়ে কাটে তাদের। শীতকালে মেলা হয় বলে বেচাবিক্রি ভালো হয়ে থাকে। মেলা শেষ করে রাতের বেলা ঘুমাতে হয় মেলাতেই। অস্থায়ী দোকানেই থাকতে হয়। রাতে ঘুমিয়ে থাকলে এই সুযোগে অসাধু ব্যক্তি দোকানে প্রবেশ করে মালামাল নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। একরকম জীবনের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হয় মেলাতে। তবুও মেলাকে বেছে নিতে হয়েছে জীবিকার জন্য।   

কার্তিকপুরের গ্রামীন মেলার দোকানি মো: ফারুক মিয়া জানায়,  মেলায় বিকিকিনির উপর নির্ভর করে চলে তাদের সংসার। ৭ মাস মেলা করার পর উপার্জিত আয় দিয়েই সারা বছর চলতে হয়।  রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়েই মেলায় মেলায় ঘুরতে হয়। মেলাকে কেন্দ্র করেই জীবন। 

এ অঞ্চলের মেলাগুলি খুবই প্রসিদ্ধ। ৫’শত বছর থেকে শুরু করে কোন মেলার  ১’শত বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। গ্রামীণ মেলার যে ঐতিহ্য, সেটি ধরে রেখেছেন মেলার দোকানিরা। মেলা শুরু হলে পরিবারের সদস্য একে অন্যকে সহযোগিতা করে থাকে সময় ভাগাভাগি করে। বিশেষ করে নারী সদস্যরা পুরুষদের সাহস ও প্রেরণা যুগিয়ে থাকে নানা কায়দায়।  বছরের ৭ মাস মেলা  শেষ করে বাড়িতে ফিরে সবাই। এ সময়টাতে একরকম অবকাশ জীবন কাটে তাদের। অর্থনৈতিকভাবে তারা যে খুব স্বচ্ছল সেটা বলা যাবে না। মেলা করে  যে আয় হয় তা দিয়েই  চলতে হয় তাদের। অনেক পরিবার অর্থকষ্টে দিন পার করে থাকে। অনেক সময় ঋণ নিয়ে চলতে হয়। মেলা শুরু হলে মেলার আয় থেকে ঋণ পরিশোধ করে নতুন করে পথচলা শুরু হয়। 

কমিরগঞ্জ এলকার মানুষের সমাজভিত্তিক জীবনযাপন। অন্যদের মতো সমাজের রীতিনীতি মেনে চলতে হয় সবাইকে। সমাজের একজন নেতা বা মাতব্বর আছে যিনি সমাজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন। কারো কোন অভাব অভিযোগ থাকলে নেতাকে বললে সবাই একসাথে বসে তা সমাধান করে দেয়। নেতার নির্দেশের বাইরে কেউ চলার সাহস দেখায় না। এখানে নেই কোন রক্তপাত কিংবা হানাহানি। সুশৃঙ্খলভাবে যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছে এই কমিরগঞ্জের মানুষজন।  মুসলিম রীতিনীতি অনুযায়ী ধর্ম পালন করে থাকেন। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা প্রধান উৎসব। এছাড়া অন্যান্য  সামাজিক আচার অনুষ্ঠান করে থাকেন তারা।

করিমগঞ্জ এলাকার সব শিশুরাই স্কুলে যায় নিয়মিত। শিশুদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ থাকলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্কুলে  যাওয়ার অনীহা দেখা দেয়। এ প্রজন্মের কেউ আর নিরক্ষর নেই। সবাই লেখাপড়ায় মনোযোগী হয়ে উঠেছে। এখানাকার মানুষের চাকরি বাকরি করার প্রবনতা না থাকলেও লেখাপড়া করে চেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলে জানান অভিভাবকেরা। মাধ্যমিক পাশ করার পর জীবিকার টানে কেউ ছুটে মেলায় মেলায় আবার কেউ  হাতের কাজ শিখে বিদেশ যাওয়ার জন্য। 

 করিমগঞ্জ পল্লীর বাসিন্দারের বছরের অধিকাংশ সময় মেলা কাটাতে হয় বলে প্রতিবেশিদের নিজ গ্রামে খুব একটা দেখা সাক্ষাতের সুযোগ হয় না। তাই নিজেদের  মেলবন্ধন ঠিক রাখতে গত কয়েক বছর ধরে বার্ষিক বনভোজনের আয়োজন করে থাকে স্থানীয়রা। সবাই মিলে একসাথে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দটাই আলাদা। 

শওকত আলী রতন: সাংবাদিক