দুর্নীতি অন্যান্য ব্যাধির মত আমাদের আক্রে ধরছে, না আমরাই দুর্নীতিকে আক্রে ধরে রাখছি ?

ঘরে বাইরে, পথে ঘাটে, অফিস আদালতে, রিক্সায় গাড়িতে সব জায়গায় সবাইকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলতে শোনা যায় । এতে তো স্পষ্ট যে, আমরা কেউ দুর্নীতি চাই না বা পছন্দ করি না। কিন্তু বাস্তবে কি দেখছি ? সব উল্টা। ঘুষ দুর্নীতি ছাড়া এক পা বাড়াবার উপায় নাই। বাজারে জিনিস কিনতে যাবেন, প্রতিটি জিনিসের দাম চড়া , কারণ […]

ঘরে বাইরে, পথে ঘাটে, অফিস আদালতে, রিক্সায় গাড়িতে সব জায়গায় সবাইকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলতে শোনা যায় । এতে তো স্পষ্ট যে, আমরা কেউ দুর্নীতি চাই না বা পছন্দ করি না।

কিন্তু বাস্তবে কি দেখছি ? সব উল্টা। ঘুষ দুর্নীতি ছাড়া এক পা বাড়াবার উপায় নাই। বাজারে জিনিস কিনতে যাবেন, প্রতিটি জিনিসের দাম চড়া , কারণ দুর্নীতি।

আইনে বলা হচ্ছে ঘুষ দেওয়া এবং নেওয়া দু-ই সমান অপরাধ । তা হলে আইন অমান্য করছি আমরা সবাই। সবাই অপরাধী ?  হ্যাঁ, আর তাই ,এটা তো বলা যায়ই যে, সমঝতার মাধ্যমেই দুর্নীতি হচ্ছে।

না, কথাটা বোধ হয় ঠিক হলো না। এখানে দুই পক্ষ রয়েছে। একপক্ষ ক্ষমতাশালী আর একপক্ষ অক্ষম, অসহায়- যাকে বাধ্য করা হয় দুর্নীতির মত অপরাধ করার জন্য। তা না হলে যে, আপনাকে অনাহারে মরতে হবে।

দুর্নীতির মত পরাক্রমশালী দানবের থেকে আপনার একমাত্র রক্ষাকবজ আইন ।  কিন্তু আইন কি বলে ? আমরা একটু আইনের বই ঘেটে দেখি। বাংলাদেশ পেনাল কোডে আছে  ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা দুজনই সমান অপরাধী। এই আইন তৈরি হয়েছে ব্রিটিশ আমলে । এখন আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। আইন কানুনও আমাদেরই তৈরি করতে হবে। কিন্তু না,  যে ইংরেজ আমাদের শাসন ও শোষণের জন্য পেনাল কোড লিখেছিল তার শুধুমাত্র নাম পরির্বতন করে বাংলাদেশ পেনাল কোড করা হলেও সংশ্লিষ্ট এই ধারার সংশোধন করা হয়নি। আর  তা তো হবারও নয়, কারণ এই আইন সংশোধনের ক্ষমতা তাদের হাতে যারা নিজের সুবিধা ছাড়া অন্য কারো কথা চিন্তা করেন না। কেন করবেন, সেই যে বলে না, নিজের ভালো পাগলেও বুঝে। তাই দেশ স্বাধীন হলেও  ইংরেজদের আইনের ফাঁক ফোঁকর ঠিকই  রয়ে গেছে। লক্ষ করলে দেখবেন আমাদের প্রচলিত আইনে আর একটা বিষয় এই যে, যার বিরুদ্ধে ঘুষ বা দুর্নীতির অভিযোগ আদালতে ওঠবে তার কিছৃ প্রমাণ করবার দরকার নেই , সব কিছু প্রমাণ করতে হবে অভিযোগকারীকেই। অভিযোগকারী তার অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে বিচারক অভিযুক্তকে বেকশুর খালাস দিবেন। সে না হয় দিলেন তিনি কিন্তু বিচার  কার্য চলাকালীন সময়ে আদালতে দুর্নীতিবাজের টাকার জোরে তার উকিল আপনাকে একেবারে নাস্তানাবুদ করে ছাড়বেন, যাতে করে আপনি আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারেন।

এইখানে আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা জানাই আপনাদের।

আপনারা হয় তো জানেন যে, দুর্নীতি দমন বিভাগের ঘুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে ফাঁদ পেতে দুর্নীতিবাজকে ধরার একটা প্রচলিত নিয়ম রয়েছে। আমার চাকরি জীবনে বহুবার এই মামলা করার সুযোগ হয়েছে। চাকরির প্রথম দিকে সেই ১৯৮৪ সালে আমি মাদারীপুর জেলা দুর্নীতি অফিসারের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকাকালীন এলাকার এক ব্যক্তি অভিযোগ নিয়ে এলেন যে, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান তার কাছে ঘুষ দাবী করছেন। আমি তাকে জানালাম যে একমাত্র হাতেনাতে ধরা ছাড়া এর প্রতিকারের আর কোন ব্যবন্থা নেই। আপনি সম্মত হয়ে লিখিত অভিযোগ করলে আমি পদক্ষেপ নিতে পারি।  তিনি রাজী হলেন এবং লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেন। এবার তাকে চেয়ারম্যানের দাবীকৃত নগদ টাকা দেবার কথা বললে তাও তিনি দিলেন। আমি দুজন নিরপেক্ষ সাক্ষীর উপস্থিতিতে টাকার গায়ে  থাকা উল্লেখিত নম্বর লিখে নিয়মানুযায়ী সিজার লিষ্ট তৈরি করে আমার কাছে রেখে টাকা ঘুষদাবীকারী চেয়ারম্যানকে দেওয়ার জন্য  অভিযোগকারীকে দিয়ে দিলাম। তিনি চলে গেলেন এবং চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করে, কবে কোথায় বসে তার থেকে টাকা নিয়ে কাজ করে দিবেন তা আমাকে বিস্তারিত জানালেন এসে।

এরপর দিন উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যানদের মাসিক মিটিং ছিল। চেয়ারম্যান তাকে বলে দিয়েছেন মিটিং শেষে তিনি পশ্চিম দিকের চায়ের দোকানে আসবেন। সে যেন টাকা নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করে।  অভিযোগকারী টাকা নিয়ে চায়ের দোকানে আর আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে উপজেলা পরিষদের আশপাশে থাকলাম। পাশেই উপজেলা পরিষদের নির্মাণ কাজ চলছিল। আমি শ্রমিকদের সাথে কথাবার্তা বলে সময় কাটাছিলাম। সবাই ভাবলো আমি ঠিকাদার। এক সময় মিটিং শেষ হলো। চেয়ারম্যান ধীর গতিতে চায়ের দোকানে প্রবেশ করলো। অভিযোগকারীর মুখোমুখি বসলো। আমাদের কেউ কেউ চায়ের দোকানে চা খেতে বসলো গিয়ে। আমি বাইরে দরজার  আড়ালে অভিযোগকারীর ইশারা পাওয়ার অপেক্ষায়। এক সময় সে আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। আমি বুঝে ফেললাম চেয়ারম্যান টাকা নিয়েছে। আমি আমার সঙ্গিদের নিয়ে প্রবেশ করলাম। চেয়ারম্যান যেন আচঁ করতে পেরেছে। দৌঁড়ে পালাবার আশায় ওঠে দাঁড়াতেই পিছন থেকে আমাদের একজন তাকে চেপে ধরাতে আর যেতে পারলো না। সে দ্রুত পকেটে হাত ঢুকালো ঘুষের টাকা বাইরে ফেলে দেবার উদ্দেশ্যে কিন্তু আমি তক্ষনিই  তার হাত ধরে ফেলাতে সে আর টাকা বাইরে ফেলতে পারলো না। খুব চালাক এবং হুশিয়ার লোক ছিল এই চেয়ারম্যান। সে জানতো টাকা তার পজিশন থেকে উদ্ধার করা না হলে সে বেঁচে যাবে। তার হুঁশিয়ারি কাজে এলো না। আমরা তড়িঘড়ি এক রকম সবার উপস্থিতিতেই আগে তৈরি করে রাখা সিজার লিষ্টে উল্লেখিত টাকার নম্বরের সঙ্গে চেয়ারম্যানের কাছে পাওয়া টাকার নম্বরের মিল পেয়ে নিয়ম অনুসারে তাৎক্ষনিক সিজারলিষ্ট তৈরি করে রেখে ঘুষ গ্রহণকারী চেয়ারম্যানকে রাতের বেলা পুলিশ হেফাজতে রাখার জন্য পাঠিয়ে দিলাম।

এরপর যথারীতি অভিযোগের  তদন্ত হলো, চার্জশীট হলো। বিচারের জন্য মামলা আদতালতে ওঠলো। পরে এক সময় সাক্ষ্য প্রদানের জন্য আমাকে মাদারীপুর বিশেষ জজ আদালতে ডাকা হলো। অভিযুক্ত চেয়ারম্যান নিজে ঘুষ গ্রহণ করেননি দাবী করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তার কোন রকম অনুতাপ ,ভয় বা লজ্জা কিছুই দেখালাম না বরং আমাকে তুচ্ছ ভাবার একটা ঝিলিক দেখলাম যেন তার চেহারায় । আমি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিজ্ঞ জজ সাহেবের দিকে তাকিয়ে মহান আদালতে বিস্তারিত ঘটনা বললাম। তিনি শুনলেন এবং নোট করলেন আমার বক্তব্য।

এবার চেয়ারম্যানের নিয়োগকৃত উকিল আমাকে জেরা শুরু করলেন। তিনি প্রথমেই বললেন, আমার মক্কেল একজন সম্মানীয় ব্যক্তি, জনগনের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি,তিনি ঘুষ দুর্নীতির মত জঘণ্য কাজে লি্প্ত হতে পারেন না।  আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে আগে কিংবা পরে কেউ এমন কোন অভিযোগ করে নাই কোন দিন ধর্মাবতার। তাঁর বিরুদ্ধে এই মামলা ষড়যন্ত্রমূলক এবং প্রতিপক্ষের কারশাজি। এবার তিনি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আঙ্গুল তুলে বলতে আরম্ভ করলেন-

আপনি , আপনি একজন অর্থ লোভী ঘুষখোর আফিসার। আপনি এই মাদারীপুর জেলায়,জেলা দুর্নীতি দমন অফিসারের  পদে থাকা কালীন সময়ে আমার মক্কেলের প্রতিপক্ষ থেকে ঘুষ নিয়ে একজন সম্মানীয় জনপ্রতিনিধিকে সমাজের চোখে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই  মামলা সাজিয়েছেন । তার কথা্য় আমি থ’ বনে গেলাম। তিনি আমাকে চার্জ করলেন , কি হলো কথা বলছেন না কেন ? বলুন, জবাব দিন, আপনি আমার মক্কেলের প্রতিপক্ষের থেকে ঘুষ নিয়ে এই মামলা সাজাননি ?

এর আগে আমি আর কোনদিন আদালতে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য দাঁড়াইনি। উকিলের কথায় আমার তখন প্র্রচন্ড রাগ হচ্ছিল। কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। মনে হচ্ছিল উকিলের কলার চেপে ধরে তার গালে কয়েকটা থাপ্পর মারি। আমার দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞ জজ সাহেব যেন আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন । তিনি বললেন, আদালতে উকিল সাহেবরা এমন বলেই থাকেন। আপনি শুধু সত্য না মিথ্যা তাই বলুন। আমার  রাগ কমে এলো।

আমি বললাম “এই সব কোন কিছুই সত্য নয়।”

এরপর আমাকে কাঠগড়া থেকে নেমে আসতে বলা হলো।

এখানে আমি খুব ছোট্ট একটা দুর্নীতির ঘটনা বললাম। এর চেয়ে অনেক বড় বড় লোকের বড় বড় ঘুষ দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে প্রতিনিয়ত। সে যাই ঘটুক, আমরা ঘুষ দুর্নীতি থেকে দূরে থাকতে চাই , মুক্ত থাকতে চাই।