হে মানব, পৃথিবীতে কি তোমার অধিকার

মানবাধিকারের ধারণা:মানবজীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য ও অপরিহার্য বিষয় হলো মানবাধিকার। মানব পরিবারের সকল সদস্যের জন্য সার্বজনীন, অখণ্ডনীয় ও অবিচ্ছেদ্য যে অধিকারসমূহ বিদ্যমান, সেগুলোকেই মানবাধিকার বলা হয়। মানবাধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার, যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সকল মানুষ সমানভাবে ভোগ করে। মানবাধিকার মানুষের জীবনকে মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও স্বাধীন করে তোলে। ব্যক্তিস্বাধীনতা, ধর্মীয় […]

মানবাধিকারের ধারণা:
মানবজীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য ও অপরিহার্য বিষয় হলো মানবাধিকার। মানব পরিবারের সকল সদস্যের জন্য সার্বজনীন, অখণ্ডনীয় ও অবিচ্ছেদ্য যে অধিকারসমূহ বিদ্যমান, সেগুলোকেই মানবাধিকার বলা হয়। মানবাধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার, যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সকল মানুষ সমানভাবে ভোগ করে।

মানবাধিকার মানুষের জীবনকে মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও স্বাধীন করে তোলে। ব্যক্তিস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এবং সমতার ধারণা মানবাধিকারের মূল ভিত্তি।

মানবাধিকারের ঐতিহাসিক বিবর্তন:
মানবাধিকার ধারণা বর্তমান যুগে হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি; এটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফল। প্রাচীন ও মধ্যযুগে মানবাধিকারের ধারণা সীমিত রাষ্ট্র বা সমাজকেন্দ্রিক ছিল। ইউরোপে ১৬১৮–১৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকদের মধ্যে সংঘটিত ত্রিশ বছরের যুদ্ধের পর জাতিরাষ্ট্র (Nation State) ধারণার বিকাশ ঘটে।
এরপর ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব (১৭৬০–১৮৪০), আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৭৭৬) এবং ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) মানবাধিকারের ইতিহাসে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। বিশেষত ফরাসি বিপ্লবের সময় প্রকাশিত Declaration of the Rights of Man and Citizen দলিলে ঘোষণা করা হয়—
“Men are born and remain free and equal in rights.”
এই ঘোষণার মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমতার ধারণা সুদৃঢ় হয়।
পরবর্তীকালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, নাৎসি বাহিনীর গণহত্যা, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ মানবাধিকারের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৪৮ সালে গৃহীত হয় সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (Universal Declaration of Human Rights), যা মানবাধিকার আন্দোলনের একটি মাইলফলক।

মানবাধিকারের উৎস:
মানবাধিকারের উৎস ইতিহাস, দর্শন, ধর্মীয় নৈতিকতা ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিক বিকাশের ফলস্বরূপ গঠিত। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান দার্শনিকদের প্রাকৃতিক আইন তত্ত্ব অনুযায়ী মানুষের কিছু অধিকার জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য, যা রাষ্ট্রের পূর্ববর্তী। মধ্যযুগে ইংল্যান্ডে প্রণীত ম্যাগনা কার্টা (১২১৫), পিটিশন অব রাইটস (১৬২৮) এবং বিল অব রাইটস (১৬৮৯) শাসকের ক্ষমতা সীমিত করে নাগরিক অধিকারের আইনি ভিত্তি স্থাপন করে। আধুনিক যুগে ১৭৭৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র এবং ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের ‘Declaration of the Rights of Man and Citizen’ মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও সমতার ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর জন লক বা জঁ-জাক রুশোর মতো দার্শনিকরা প্রচার করেন যে, মানুষ জন্মগতভাবেই কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকার লাভ করে, যা কোনো রাষ্ট্র বা সরকার কেড়ে নিতে পারে না। ওই সময়ে জন লক, জাঁ জ্যাক রুশো, মন্টেস্কু ও জন স্টুয়ার্ট মিলের দার্শনিক চিন্তাধারা মানবাধিকারের নৈতিক ও বৌদ্ধিক কাঠামো সুদৃঢ় করে। পরবর্তীকালে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মানবিক বিপর্যয় আন্তর্জাতিক পরিসরে মানবাধিকার সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা জোরালো করে তোলে, যার পরিণতিতে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৪৮ সালে সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা গৃহীত হয়, যা আধুনিক মানবাধিকারের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও সার্বজনীন উৎস হিসেবে স্বীকৃত।

মানবাধিকারের বৈশিষ্ট্যসমূহ:
দীর্ঘ বিকাশ এবং বিবর্তনের পর, বিশ্ব রাজনীতির নানা ইতিহাস পেরিয়ে অবশেষে ১৯৪৮ সালে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ মানবাধিকারের সর্বজনীন দলিল ঘোষণা করে। সেই মানবাধিকারের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে, তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। সেগুলি হলো—
প্রথমত, সমস্ত মানবজাতি জন্মগতভাবে সমান, অধিকার ভোগ এবং মর্যাদায় সমতুল্য। সমস্ত মানুষ সমান। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, চামড়ার রং, জন্মস্থান, সাংস্কৃতিক ভিন্নতা ব্যক্তিকে সমগ্র মানবজাতি থেকে আলাদা করতে পারে না। সমস্ত মানুষ জন্মগতভাবেই সমান এবং সম অধিকার ও সম মর্যাদার দাবিদার।
অর্থাৎ মানবাধিকারের বৈশিষ্ট্য হলো সর্বজনীনতা (universality)। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এই সর্বজনীনতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।, প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব বা কর্তব্য হলো সকল নাগরিকের মানবাধিকার এবং মৌলিক অধিকার রক্ষা করা। সেই সঙ্গে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ১ নং ধারায় বলা হয়েছে—
“All human beings are born free and equal in dignity and rights.”
দ্বিতীয়ত, মানবাধিকারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি সহজাত (inherent)। মানবাধিকার সহজাত, কারণ তা কিনতে হয় না বা উপার্জন করতে হয় না অথবা মালিকানা অর্জন করতে হয় না। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সেটা অর্জন করে, তাই এটি সহজাত।
তৃতীয়ত, মানবাধিকার হলো মৌলিক, কারণ তা ছাড়া মানুষের জীবন এবং মর্যাদার কোনো মূল্য থাকবে না।
চতুর্থত, মানবাধিকার হলো অপরিহার্য (inalienable)। মানবজীবনের অস্তিত্ব থেকেই মানবাধিকার অপরিহার্য। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, চামড়ার রং, আর্থিক অবস্থান নির্বিশেষে সকল মানুষ মানবাধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।
পঞ্চমত, মানবাধিকার হলো অবিভাজ্য (indivisible)। অর্থাৎ মানবাধিকারকে বিভাজন করা যায় না। অন্যান্য অধিকার ভোগ করার সঙ্গে মানবাধিকারও অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত। কোনো মানুষকে তার মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। নাগরিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক—বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যেক ব্যক্তিমানুষের মানবাধিকারগুলো তাদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে সম্পৃক্ত, সহজাত। অন্যের অধিকারের মূল্য একজীবনের জীবনধারণের পর্যায় মাত্রের সঙ্গে আপস করা যায় না।
ষষ্ঠত, মানবাধিকার হলো অপ্রত্যাহারযোগ্য (irrevocable)। এই অধিকার কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র ফেরত নিতে পারে না। কোনো সরকারের এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা নেই, যেহেতু এই মানবাধিকারগুলো হলো পবিত্র, অলঙ্ঘনীয় ও অপরিবর্তনীয়।
সপ্তমত, মানবাধিকার রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে সীমিত করে। নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে রাষ্ট্র এবং সরকার দায়বদ্ধ থাকে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (১৯৪৮)-এর পর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে যেকোনো সদস্য রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ।

বর্তমান সময়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি: একটি সামগ্রিক বিশ্লেষণ:-
বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার পরিস্থিতি একই সঙ্গে অগ্রগতি ও সংকট—এই দুই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে আন্তর্জাতিক আইন, চুক্তি ও সচেতনতা বেড়েছে; অন্যদিকে যুদ্ধ, কর্তৃত্ববাদ, বৈষম্য ও প্রযুক্তির অপব্যবহার মানবাধিকারের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করেছে।
বর্তমান সময়ে সভ্য সমাজে ও সভ্য বিশ্বে মানবিক দিকগুলো এতটা বিপন্ন হবে তা মানব জাতির জন্য শুধু ব্যর্থতাই নয় পরবর্তী প্রজন্ম সংকট ও হুমকির ভিতরে ফেলে দিবে।
একটি দেশ কতটা সভ্য তা পরিমাপ করা যায় সে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি দেখে ।যেখানে ভয় এবং অভাব বেশি সেখানে মানবাধিকার ততোই কম ।
বর্তমান বিশ্বে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সশস্ত্র সংঘাত দেখা যাচ্ছে।
প্রযুক্তির বিকাশ মানবাধিকারের জন্য নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই তৈরি করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি সরাসরি জীবন, স্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার অধিকারকে প্রভাবিত করছে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিশ্ব রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদের উত্থান সংখ্যালঘু অধিকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক দেশে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও কার্যকর তদন্ত ও বিচার হয় না, ফলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি (culture of impunity) তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উন্নয়নের নামে অনেক সময় মানবিক অধিকার উপেক্ষিত হচ্ছে।
ধর্মীয়, জাতিগত ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, ঘৃণাভিত্তিক সহিংসতা ও সামাজিক বঞ্চনা অনেক দেশে বেড়ে চলেছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি,এবং দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ এখনও ন্যায়বিচার ও সমান অধিকারের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা একটি গুরুতর মানবাধিকার সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। গৃহস্থালি সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, শিশু শ্রম ও শিশু বিবাহের মতো অপরাধ অনেক সমাজেই উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান। আইন থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ ও সামাজিক সচেতনতার অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মানবাধিকার কোনো দয়া বা দান নয়, এটি প্রতিটি মানুষের জন্মগত পাওনা। বর্তমান বিশ্ব এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যদি রাষ্ট্রসমূহ সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতাকে প্রাধান্য না দেয়, তবে সভ্যতার এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে। একটি সুন্দর পৃথিবী গড়তে হলে অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে বিশ্ববাসীকে একতাবদ্ধ হওয়া এখন সময়ের দাবি।
এই অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যেও আশার দিক রয়েছে। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম ও সচেতন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংলাপ, আইনি সংস্কার এবং মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক আন্দোলন মানবাধিকারের ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী।