সভ্যতার অগ্রগতির গল্পটা আসলে মানুষের ভাবনার গল্প। মানুষ যত প্রশ্ন করতে শিখেছে, ততই সে এগিয়েছে, জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প আর সংস্কৃতির পথে। কিন্তু আজকের সময়ে এসে একটা অদ্ভুত দ্বন্দ্ব চোখে পড়ে। চারপাশে তথ্যের ছড়াছড়ি, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি আর মুহূর্তে যোগাযোগের সুযোগ, সব থাকলেও আমরা যেন ধীরে ধীরে ভাবার ক্ষমতাটা হারাচ্ছি। তাই অনেকেই বলছেন, আমরা এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। তাহলে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই আসে, আমরা কি সত্যিই চিন্তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি?
একসময় ভাবা ছিল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। বই পড়া, তর্ক করা, মতের অমিল নিয়ে কথা বলা, দর্শনচর্চা, এসবই মানুষকে গভীরভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে। এখন সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছে দ্রুত ভোগের সংস্কৃতি। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনবরত স্ক্রল করা, কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও, আগে থেকেই তৈরি করা মতামত—সব মিলিয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে যেখানে ভাবার দরকারই পড়ছে না। আমরা প্রশ্ন তুলি না, শুধু যা দেওয়া হচ্ছে তা গ্রহণ করি।
এই সংকটের বড় কারণগুলোর একটি হলো তথ্য আর জ্ঞানের পার্থক্য ভুলে যাওয়া। আজ তথ্য পাওয়া খুব সহজ, কিন্তু সেই তথ্য নিয়ে ভেবে, বিশ্লেষণ করে জ্ঞান তৈরি করার ধৈর্য আমাদের কমে যাচ্ছে। আমরা কয়েকটা শিরোনাম দেখেই মত বানিয়ে ফেলি, পুরো বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি না। এর ফলেই চিন্তা হয়ে উঠছে ওপর ওপর, আবেগে ভরা আর অনেক সময় মারাত্মকভাবে বিভ্রান্তিকর।
শিক্ষাব্যবস্থাও এই সমস্যার বাইরে নয়। নম্বর আর পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা চিন্তার চেয়ে মুখস্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এতে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে ভয় পায়, আলাদা করে ভাবার সাহস হারায়। ফলাফল হিসেবে এমন এক প্রজন্ম গড়ে উঠছে যারা অনেক তথ্য জানে, কিন্তু যুক্তি দিয়ে ভাবতে জানে না, ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা। ভাবা সহজ কাজ নয়, এতে সময় লাগে, মানসিক শক্তি লাগে। আধুনিক জীবনে আমরা সহজ পথেই হাঁটতে অভ্যস্ত। তাই অন্যের চিন্তা নিজের বলে মেনে নেওয়াই অনেক সময় আরামদায়ক মনে হয়। কিন্তু এতে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কমে যায়, আর সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবু পুরো ছবিটা অন্ধকার নয়। ইতিহাস বলে, সংকট থেকেই নতুন ভাবনার জন্ম হয়। আজও অনেক মানুষ আছেন যারা প্রশ্ন করছেন, লিখছেন, ভাবছেন, হয়তো খুব চুপচাপ, কিন্তু গভীরভাবে। দরকার শুধু চিন্তাকে আবার সামাজিকভাবে মূল্য দেওয়া। পড়ার অভ্যাস বাড়ানো, যুক্তিনির্ভর বিতর্ককে উৎসাহ দেওয়া, ভিন্নমতকে সম্মান করা আর শিক্ষাব্যবস্থায় চিন্তাকে কেন্দ্রে রাখা এসবই এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, চিন্তা বিমুখ হওয়া মানুষের স্বভাব নয়, এটা পরিস্থিতির তৈরি ফল। আমরা চাইলে আবার ভাবতে শিখতে পারি। কারণ চিন্তাই মানুষকে মানুষ করে তোলে। চিন্তা হারালে আমরা শুধু ভোক্তা হয়ে থাকব, সৃষ্টিশীল মানুষ হয়ে উঠতে পারব না। তাই আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন একটাই আমরা কি আবার চিন্তা করতে শিখব, নাকি চিন্তাহীন জীবনের স্রোতে ভেসে যাব?
লেখক: সমাজকর্মী।