সাহিত্য ও সংস্কৃতি

সাহিত্য যেমন সংস্কৃতিরই একটি ধারা, তেমনি সাহিত্যের বিবিধ শাখায় থাকে সংস্কৃতির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। সংস্কৃতির মাধ্যমে যদি ফুটে উঠে কোন জাতির জীবন জিজ্ঞাসা, তবে সাহিত্যের মধ্যে হয় জীবনের মূল্যবোধের বিচার। সংস্কৃতি ধারণ করে সাহিত্যকে, সাহিত্য বিকশিত করে সংস্কৃতিতে। দু’য়ে মিলে গড়ে তোলে একটি বৃহত্তর জাতির ব্যক্তি মানসের সামগ্রিক প্রতিচ্ছবি।
ভাষা হচ্ছে আমাদের চিন্তা-ভাবনা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। এই মাধ্যমকে পুঁজি করেই প্রধানত গড়ে উঠে আমাদের সাহিত্য। তাই সাহিত্য সংস্কৃতির অন্য যে কোন শাখার তুলনায় অতি দ্রুত প্রবেশ করতে পারে মানুষের মনের গভীরে। ফলশ্রুতিতে সংস্কৃতির অন্যান্য যে কোন শাখার চেয়ে সাহিত্য হয় সর্বাধিক জনপ্রিয়।
আমার দৃষ্টিতে সঙ্গীত সাহিত্যেরই একটি শাখা। কারন সঙ্গীতের মাধ্যম হলো ভাষা এবং সুর। সঙ্গীতের মাঝে থাকে সঙ্গীত নির্মাতার চিন্তা-ভাবনার প্রতিচ্ছবি। তার সুখ-দুঃখের পুঞ্জীভূত ফসল এবং তার বিশ্বাস। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। এই ব্যতিক্রম কখনো কখনো এমন প্রকট হয়ে দাঁড়ায় যে, তখন সাহিত্য বা সংস্কৃতির সঠিক সংজ্ঞা নির্ণয় করা খুবই দুরূহ হয়ে যায়। সত্যি বলতে কি, সাহিত্য বা সংস্কৃতির সঠিক সংজ্ঞা আমারও জানা নেই। তাই আমি শুধু আমার বিশ্বাসের কথাগুলো আপনাদের সামনের তুলে ধরছি।
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ তার নিজের চিন্তা-ভাবনায় কাজ করে আসছে। প্রত্যেক মানুষ এক নয়। আর তাদের চিন্তা-ভাবনাও এক নয়। ঠিক তেমনি জীবনকেও সবাই একই দৃষ্টি ভঙ্গিতে দেখে না। তবুও সুন্দর চিরদিনই সুন্দর, সত্য চিরদিনই সত্য। এই সুন্দর সত্যকে সবার উপলব্ধি করার ক্ষমতা থাকে না। আর যাদের বা থাকে তাদের আবার সুন্দর ভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা থাকে না। এই সত্য ও সুন্দর হতে পারে ব্যক্তিগত, কি সামাজিক, রাজনৈতি কিংবা বিবিধ শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত।
একটি স্বার্থক সাহিত্য তখনই রচিত হয়, যখন লেখক তাঁর সেই বিশ্বাসকে, তার সঠিক চিন্তা-ভাবনাকে ভাষার অলংকার গায়ে জড়িয়ে প্রকাশ করতে পারেন শক্তিশালী ও দক্ষ লেখনীর মাধ্যমে। এই মাধ্যমগুলো সাহিত্যের বাহক বলেও ভুল বলা হবে না।
সাহিত্য যখন স্বার্থক হয়ে উঠে, তখন তা সত্যিকার অর্থে মানুষের গভীরে ঢুকে তাকে প্রভাবিত করে। একজন মানুষের সমগ্র জীবনের ছন্নছাড়া অভিজ্ঞতা থেকে যা শেখা না যায়, একটি স্বার্থক সাহিত্যের মাত্র একটি বাক্য থেকে তা গ্রহণ করা যায়।
আগেই বলেছি, সব মানুষ এরকম নয়। যদি তাই হত তাহলে প্রত্যেক সাহিত্যিকই হতেন এক একজন রবীন্দ্রনাথ। প্রত্যেক সাহিত্যিকই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। তা না হলে সাহিত্যের প্রসার কখনোই সম্ভব হতো না। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি যা কিছু হোক না কেন, মানবীয় গুণাবলীর উর্ধ্বে কিছুই নয়। মানুষকে ঘিরেই এরা বেঁচে থাকে, বিকশিত হয়। এ কথা শুধু আমার নয়। বড় বড় সাহিত্যিকরাও এ কথা স্বীকার করেছেন অকপটে। হতে পারে আমাদের দৃষ্টি-ভঙ্গি, ধ্যান-ধারণা ভিন্ন কিন্তু আমরা সকলেইতো মানুষ। আর সাহিত্যিকরাও আমাদের ব্যতিক্রম নয়। অনেক সাহিত্যিকের লেখাতেই মানুষের কথা থাকে, থাকে তাদের আবেগের কথা, ব্যক্তি সত্ত্বার কথা। কিন্তু সেই স্বতন্ত্র বৈশিষ্টরে কারণে অনেক পুরাতন কথা চিরকালই আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে নতুন নতুন আঙ্গিকে, নতুন নতুন বিশ্বাসে। আর আমরা তা পড়ে হচ্ছি বিষ্মিত! দারুণ উৎসাহ নিয়ে পান করছি সাহিত্যের অমৃত সুধা।
অনেক লেখক নিজেদের সুনামের জন্য লিখেন। কিন্তু তাদের লেখার মধ্যে ঐকান্তিক নিষ্ঠার বিন্দুমাত্র ছাপ পর্যন্ত থাকে না। ফলে তাদের সাহিত্য হয় ব্যর্থ। এই ব্যর্থতা আমাদের সৃষ্টিশীল সাহিত্যকে অনেক পিছনে ফেলে রেখেছে। কিন্তু সংস্কৃতির সঠিক লালনের জন্য এই সাহিত্যকে নিতে হবে বহুদূর। একে অবহেলা করলে চলবে না। আর এর প্রতি আমাদের সাহিত্যিকদের দিতে হবে উদার সৃষ্টি।
কেননা, সৃষ্টির প্রতি উদাসীনতা স্রষ্ঠাকে মানায় না।

লেখক: সংগঠক ও সমাজসেবক