আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কায়কোবাদের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য । তৎকালীন পুঁথি সাহিত্যের বিপুল জোয়ারের উচ্ছাস উপেক্ষা করে তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন । তার ১৫ টি কাব্য প্রকাশিত হয়েছে এবং অপ্রকাশিত কাব্যের পরিমাণও কম নয়। এ কাব্যগুলোর মধ্যে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি কবির যে অনুরাগ সে বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।
কায়কোবাদের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে সর্বপ্রথম ইতিহাস ঘটনাশ্রয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘অশ্রুমালা’ (প্রথম প্রকাশ ১৮৯৬, ২য় প্রকাশ ১৯১৪, ৩য় প্রকাশ ১৯১৮, ৪র্থ প্রকাশ ১৯২৭, পঞ্চম প্রকাশ ১৯৪৯ এবং ষষ্ঠ প্রকাশ বাংলা ১৩৮০ সাল), এ গ্রন্থের সিরাজ সমাধি, মোশ্লেম শ্মশান, দিল্লী, তাজমহল, আবাহন প্রভৃতি কবিতায় তার অতীত স্মৃতি মন্থনে বেদনাবোধের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ‘সিরাজের সমাধি’ কবিতায় কবি নবাব সিরাজউদ্দৌলার জীবনের কথা বলেছেন, বলেছেন মীর জাফরের দেশদ্রোহিতার কথা। এই কবিতায় কবি সিরাজের প্রতি তাঁর অব্যক্ত বেদনা প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে মীর জাফরের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। বৃটিশ অনুরক্ত ঐতিহাসিক ও লেখকদের বড় অংশ অনেক দিন সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রের দোষত্রুটির প্রকাশ ঘটিয়ে ভারতে বৃটিশ শাসন প্রতিষ্ঠাকে জায়েজ করতে চেয়েছেন। অথচ চারিত্রিক ত্রুটিতে ইংরেজরা যে সিরাজকেও অতিক্রম করেছিল তাঁর উল্লেখ কোথাও নেই। মীর জাফরের প্রতি কবির ঘৃণা আজ সকল বাঙালীরও ঘৃণা।
‘মোশ্লেম শ্মশান’ কবিতায় কবি কায়কোবাদ অতীত ঐতিহ্যময় ‘দিল্লী’র কথা স্মরণ করে ব্যথিত হয়েছেন। কুতুব মিনার, পুরানো অট্টালিকা, হুমায়ুনের সমাধি, হামিদা বানুর সমাধি কবির কলমের ছোঁয়ায় যেন প্রাণ পেয়েছে। কবি নিপূণ চিত্রকরের মতো এগুলো চিত্রিত করেছেন। শাহজাহান ও মমতাজের বিশ্রুত প্রেমের স্মৃতিকে স্মরণ করে কবি ব্যথিত হয়েছেন ‘তাজমহল’ কাব্যে। আবাহন কাব্যের উপজীব্য বিষয় হচ্ছে কাবুল অধিপতি এনাতুল্লার ভারত আগমন।
‘অশ্রুমালা’ কবি কায়কোবাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক কাব্যের সমাহার। এ গ্রন্থের জন্য কবি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এ কাব্যগ্রন্থ পাঠ করে নবীন চন্দ্র সেন কোলকাতার আলীপুর থেকে কবিকে লেখেন ‘মুসলমান যে বাংলা ভাষায় এমন সুন্দর কবিতা লিখিতে পারে, আমি আপনার উপহার না পাইলে বিশ্বাস করিতাম না। অল্প সুশিক্ষিত হিন্দুরই বাংলা কবিতার উপর এই রূপ অধিকার আছে।’
ভারতের ঐশ্বর্যের ক্রমাবনতি কবিকে ব্যথিত করেছে। দিল্লীসহ ভারতের অতীত গৌরবময় কীর্তির মলিন ও ভঙ্গুর দিক তাকে ব্যথিত করেছে সত্যি, কিন্তু হতাশা থেকে কবি মুক্তি চেয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস ভারতে আবার মুসলিম শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে ঐশ্বর্য ফিরে পাবে। মহাশ্মশান মহাকাব্যের মাধ্যমে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। (১ম প্রকাশ ১৯০৩, ২য় সংস্করণ ১৯১৭, এরপর যথাক্রমে ১৯২৫, ১৯৪০, ১৯৬৭ এবং ১৯৭৪ সালে ৬ষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হয়।)
ভারত উপমহাদেশের ১৭৬১ সালের বিখ্যাত পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধকে অবলম্বন করে মহাশ্মশান রচিত। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে পানিপথ একটি উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গন। কাব্য রচনায় পানিপথ বেছে নেয়ার ব্যাপারে কবির নিজস্ব অভিমত- ‘এই পানিপথই হিন্দুদিগের কুরুক্ষেত্র। এই স্থানেই কুরু পান্ডবের ভীষণ হিন্দুদের সৌভাগ্য সূর্য চির অস্তমিত। এই স্থানেই মুসলমান বীর পুরুষগণ মহা বিক্রমে মুসলমান লোদী বংশ ধ্বংশ করেছিলেন। এই স্থানেই মুসলমান আকবর তাহার স্বজাতীয় পাঠান সম্রাটের হিন্দুর সেনাপতি হিমুকে বিধ্বস্ত করিয়া তাহার বিস্তৃত রাজ্যের ভিত্তি মূল সংস্থাপিত করেন। এই ভীষণ সমরানলে মোশ্লেম কুলের কত বীর দগ্ধীকৃত হইয়াছে, কত উজ্জ্বল নক্ষত্র খসিয়া পড়িয়াছে, তাহা কে বলিবে? তাই বলিয়াছিলাম একপক্ষে পানিপথ যেমন হিন্দুর গৌরবের সমাধি ক্ষেত্র, অপর পক্ষে সেইরূপ মুসলমান গৌরবেরও মহাশ্মশান।’
গ্রন্থের নাম মহাশ্মশান রাখার পেছনের কারণটি কায়কোবাদের উক্তি থেকে বোঝা যায়। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও মানব সভ্যতার পতন তাকে ব্যথিত করেছিল বলে সংগ্রামের রূপের মধ্য দিয়ে কবির যাতনা প্রকাশিত হয়েছে।
মহাশ্মশান তিন খন্ডে লেখা। প্রথম খন্ডে ২৯টি সর্গ, দ্বিতীয় খন্ডে ২৪টি সর্গ ও তৃতীয় খন্ডে ৭টি সর্গ আছে। ভারতে হিন্দু রাজত্ব পুণরায় স্থাপনের জন্য পেশ বা পুত্র বিশ্বনাথ ও সেনাপতি সদাশিবের নেতৃত্বে মারাঠা জাতির দিল্লী রাজশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং প্রবল পরাক্রমে রোহিলা অধিপতি নজীবউদ্দৌলা ও আফগান রাজ আহমদ শাহ আবদালী তার প্রত্যুত্তর এবং পরিনামে মারাঠা শক্তির পরাজয় মহাশ্মশানের উপজীব্য বিষয়। এ কাব্যে বহু ঐতিহাসিক চরিত্রের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। এই কাব্যের সফল দিক হচ্ছে নারী চরিত্র চিত্রণে ও তাদের অমিত তেজ ও আত্মশক্তি রূপায়নে।
যদিও মহাশ্মশান মহাকাব্যে কবি ঐতিহাসিক চরিত্র চিত্রণে অনেকের প্রতি যথার্থ ব্যবহার করেননি। মহাকাব্যে বীর ও বীরদের গুণ যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় তা এখানে স্পষ্ট নয়। পুরুষ চরিত্রগুলো অতিরিক্ত প্রেমভাবে দুর্বল। তাই পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধকে অবলম্বন করে লেখা হলেও প্রেমের বর্ণনাই অনেক ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে উঠেছে। এই কাব্যগ্রন্থে মৌলিকত্ব, অসম্প্রদায়িক ও নিরপেক্ষ উপস্থাপনা লক্ষ্য করা যায়। কবির ইতিহাস সচেতনতা ও ঐতিহ্যের প্রীতির দিক থেকে কাব্যগ্রন্থটি মূল্যবান। বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য মহাকাব্যের তুলনায় মহাশ্মশান কাব্য মৌলিকত্বের দাবি করতে পারে। বাংলা সাহিত্যের অন্য মহাকাব্য মেঘনাদ বধ ও বৃত্ত সংহার কাব্যদ্বয় মৌলিক সৃষ্টি নয়। কারণ এ কাব্যের বিষয়বস্তু রামায়ন ও মহাভারত এই দুই মহাকাব্যের অংশ বিশেষ থেকে নেয়া। কিন্তু মহাশ্মশান রচনায় কবি তেমন কোন মহাকাব্য উপস্থাপনা করেননি। মহাশ্মাশান কাব্যের বিষয়বস্তু ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে সংগৃহিত করে কাব্যের সরস তুলিতে কবি একেছেন। এটাই মহাকাব্যের মৌলিকতা।
মহাশ্মশান কবি নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে হিন্দু-মুসলমানদের শৌর্য-বির্যের কাহিনী বিবৃত করেছেন। উভয় ধর্মাবলম্বীদের চরিত্র চিত্রণে উভয়ের চরিত্র আদর্শ যাতে সমুন্নত থাকে সেদিকে কবির লক্ষ ছিল। সেজন্যেই তিনি একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকে কাহিনী ও চরিত্র চিত্রণ করেছেন।
মহাশ্মশানের অসাম্প্রদায়িক উপস্থাপনা সমসাময়িক অনেক মুসলমান কবি সাহিত্যিককে খুশি করতে পারেনি। বহুল সমালোচিতও হয়েছেন কবি। নবনূর পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ এমদাদ হোসেন তার পত্রিকায় মহাশ্মশান কাব্যে অনৈসলামিক ও অশ্লীল ভাব শীর্ষক প্রবন্ধে কায়কোবাদের কবিতাগুলোর সমালোচনা করেছেন। (মহাশ্মশান হতে হিন্দু ভৈরবী দ্বারা গীত একটি গাদা স্তর ও একটি কালী সঙ্গীত উদ্বৃত করে) এ প্রবন্ধে বলা হয় কায়কোবাদ মুসলমান হইয়াও মোসলেম বিদ্বেষের পরিচয় দিয়াছেন। তাহার কাব্যে হিন্দু শান শওকত, হিন্দু শৌর্য বীর্য, হিন্দু জ্ঞান বুদ্ধি যতটা ফুটিয়ে তোলা হয় মুসলিমদিগের বেলায় তা ফুটিয়ে তোলেন নাই। মহাশ্মশান অশ্লীল বলার কারণ সম্পর্কে উক্ত প্রবন্ধে বলা হয় যে, কবি কায়কোবাদ ইব্রাহিম কার্দি ও জোহরার বাল্য প্রেম, প্রাক বিবাহ ও বিবাহ পরবর্তী কথাবার্তায় অশ্লীলতার পরিচয় দিয়েছেন। অবশ্য এই সমালোচনা সত্বেও মহাশ্মশান পাঠক আনুকুল্য পেয়েছে, সমাদৃত হয়েছে উভয় ধর্মাবল্বীর কাছে। স্বাজাত্যবোধ, ঐতিহ্য ও স্বদেশপ্রেমের এক মহৎ প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে কবি এই কাব্য রচনা করেছেন। বলা যায় তিনি যথেষ্ঠ সার্থকও হয়েছেন।
শিবমন্দির (জীবন্ত সমাধি) সংস্করণ ১৯৬৯, ৪র্থ সংস্করণ ১৩৮১ কাব্যগ্রন্থ একটি জমিদার পরিবারের উত্থান-পতনকে কেন্দ্র করে রচিত। কবি টাঙ্গাইলের ধনবাড়ির জমিদার নবাব আলী চৌধুরী ও কালিহাতি হাই স্কুলের হেড মাষ্টার কালী কৃষ্ণ নিয়োগীর কাছ থেকে একটি সত্য ঘটনার উপাদান সংগ্রহ করে এই কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন।
এই কাব্যগ্রন্থের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজী বলেন, মুসলমান জমিদারদের আরাম আয়েশ ও প্রিয়তা এবং জমিদারীর কাজকর্মের প্রতি উদাসীনতা এবং এক শ্রেণীর কর্মচারীদের উপর নির্ভরশীলতা মুসলমান জমিদারদের কি প্রকার অনিষ্ট সাধন ঘটিয়েছিল কায়কোবাদের শিব মন্দির তার এক জ্বলন্ত চিত্র।
মহরম শরীফ বা আত্মবিসর্জন (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৯, ২য় সংস্করণ ১৯৪৯, ৩য় সংস্করণ ১৯৭০) অপর ইতিহাস আশ্রয়ী কাব্য। ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কারবালার বিয়োগান্তর ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই কাব্যটি রচিত। এই ঘটনাই পরবর্তীতে মুসলিম জগতে উমাইয়া বংশকে প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে এবং বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের সূচনা করে। বাংলা সাহিত্যে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচিত হয়েছে কারবালা ও মহরমকে কেন্দ্র করে। মীর মোশারক হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ মুহাম্মদ হামিদ আলীর ‘কাশেম বধ’ ফজলুর রহিম চৌধুরীর ‘মহররম চিত্র’, মুন্সী জোনাব আলীর ‘শহীদে কারবালা’ এবং কবি মোজাম্মেল হক ও কাজী নজরুল ইসলামের মহররম বিষয়ক কবিতায় ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ রয়েছে। এগুলো অনৈতিহাসিক ঘটনায়ও পরিপূর্ণ। এগুলো সহজেই ইসলামের অতীত সত্য ঘটনা থেকে পাঠকদের ভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে। কায়কোবাদ ‘মহররম শরীফ’ কাব্যের মাধ্যমে এসব গ্রন্থের ভ্রান্তির দিক তুলে ধরেছেন এবং কাব্যের ‘কৈফিয়ৎ’ অংশে এসব ভুল তথ্য পরিবেশনাকে খন্ডন করেছেন। কবির ভাষায়- আমি মহররম শরীফ বা আত্মবিসর্জন কাব্য লিখিতে যাইয়া সম্পূর্ণরূপেই ইতিহাসের অনুসরণ করিয়াছি। কাব্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য কল্পনার সাহায্য লইয়া কোনরূপ অলীক ঘটনার অবতারণা করি নাই।’ মহররম শরীফ কাব্যের ঐতিহাসিক মূল্য আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। কবি ঘটনার বর্ণনার সাথে সাথে প্রয়োজনীয় অংশের পৃষ্ঠার নীচে টীকা দিয়ে এর সত্যতাকে জোরালো করেছেন। ড. মহম্মদ শহীদুল্লাহ এই কাব্যের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বলেন, তার মহরম শরীফ কাব্য বটে। কিন্তু তিনি এতে ইতিহাসের মর্যাদা পুরোপুরি রক্ষা করেছেন। মহররম এর চূড়ান্ত মূল্যায়নে বলা যায় এটি একাধারে কাব্য ও ইতিহাস। এ কাব্য রচনা করে তিনি যেমন কাব্যমোদীদের রস পিপাশা নিবৃত্ত করেছেন তেমনি ঐতিহাসিকদের খোরাক জুগিয়েছেন আসল ইতিহাসের। এ কাব্য প্রশংসার সাথে সাথে সমালোচিত হয়েছে। এতে কাব্য গৌরব রক্ষা হয়নি বলে কেউ কেউ অভিযোগ এনেছেন। প্রফেসর আনিসুজ্জামান বলেন এতে কাব্য গৌরব রক্ষা হয় নি। কাব্যের উদ্দেশ্য যে সৌন্দর্য সৃষ্টি তা এতে নেই। অতি মাত্রায় কবি এখানে ইতিহাসকে ধরে রাখতে চেয়েছেন। প্রতি পৃষ্ঠায় ফুট নোট তার প্রমাণ। কাব্য মূল্যায়নে একথা যথার্থ হলেও ঐতিহাসিক কাহিনী নির্মাণের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় কবি কায়কোবাদ সফল হয়েছেন।
তার কাব্যের কয়েকটিতে সমকালীন ইতিহাস ও রাজনীতি ফুটে উঠেছে। হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষের স্থলে তিনি চেয়েছিলেন জাতীয় ঐক্য, গেয়েছেন ঐক্যের গান। এ দুটি সম্প্রদায়কে তিনি এক জাতি ও এক মায়ের সন্তান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ভারত উপমহাদেশে বৃটিশ শাসনামলে বাঙালী কবি-সাহিত্যিকগণ যখন বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তেমন কিছু লেখেন নি সেই যুগে সরকারি চাকুরে হয়েও কায়কোবাদ কাব্যে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় ইংরেজ শাসনের সমালোচনা করেছেন, শোষণের প্রতিবাদ করেছেন।
কায়কোবাদের ঐতিহাসিক কাব্যের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি চরিত্র চিত্রণে কল্পনার আশ্রয় নেননি। ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে কাব্যের উপাদান সংগ্রহ করেছেন। তার ইতিহাস চেতনা ছিল অত্যন্ত প্রখর। যার প্রমাণ হচ্ছে কবিতার দুর্বোধ্য বিষয় পৃষ্ঠার নিচে টীকা আকারে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি ধার্মিক ছিলেন বটে, কিন্তু ধর্মীয় আবেগে আপ্লুত হয়ে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটাননি। যার যা ভূমিকা সেভাবেই কবিতায় চরিত্রগুলো এনেছেন। কাব্যে তার সত্যনিষ্ঠা সমকালীন এবং কায়কোবাদ মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির মধ্যেই জাতীয় ঐতিহ্যের পুনরুত্থান সম্ভব। সমকালীন অনেক কবি ও গল্পকার সাম্প্রদায়িকতার বৃত্ত অতিক্রম করতে পারেননি। সেদিক থেকে কায়কোবাদ স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেন। তার কাব্যের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক মনোভাব। যার ফলে কায়কোবাদ ও ভন্ড-প্রতিক্রিয়াশীল-ধর্ম ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদদের মধ্যে ব্যবধানটি এতই দীর্ঘ ছিল যে তাঁকে প্রতিক্রিয়াশীলরা কখনো ব্যবহার করতে পারেনি। তাদের এই অপারগতার জন্য পাকিস্তান আমলে কায়কোবাদ অবহেলিত হয়েছেন।
সূত্র:
১। মহসিন হোসাইন, মহাকবি কায়কোবাদঃ জীবন ও সাধনা, মাসিক অগ্রপথিক, ৯ আগস্ট ১৯৯০, সংখ্যা পৃ-১৯।
২। কায়কোবাদ, মহাশ্মশান, ভূমিকা, ( ঢাকা-১৯৬১)
৩। দেওয়ান আবদুল হামিদ, মহাকবি কায়কোবাদ, মহাকবি কায়কোবাদের ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকী স্মারক গ্রন্থ।
৪। কায়কোবাদ, মহররম শরীফ বা আত্মবিসর্জন কাব্য, ২য় সংস্করণ।
৫। কায়কোবাদ, মহররম শরীফ
৬। মোহাম্মদ বদরুল আমীন খান, কবি কায়কোবাদের কাব্য ভাবনা( ঢাকা-১৯৮০)
লেখক: বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন। অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সাবেক ডিন, কলা অনুষদ, ঢাক বিশ্ববিদ্যালয়।