আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় ১৯৫৭ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহ। বিএ পরীক্ষা দিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার ব্যবস্থা করলাম। তার আগে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে কয়েক দিনের জন্য এলাম গ্রামে। বাবা জানালেন নবাবগঞ্জ স্কুলের হেড মাস্টার কৃষ্ট বাবু দেখা করতে বলেছেন। গেলাম দেখা করতে, তিনি আমাকে স্নাতক পরীক্ষার ফল বের না হওয়া পর্যন্ত স্কুলের শিক্ষক হিসেবে […]
আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়
১৯৫৭ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহ। বিএ পরীক্ষা দিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার ব্যবস্থা করলাম। তার আগে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে কয়েক দিনের জন্য এলাম গ্রামে। বাবা জানালেন নবাবগঞ্জ স্কুলের হেড মাস্টার কৃষ্ট বাবু দেখা করতে বলেছেন। গেলাম দেখা করতে, তিনি আমাকে স্নাতক পরীক্ষার ফল বের না হওয়া পর্যন্ত স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কাজ করতে বললেন। শিক্ষকের অধিকার নিয়ে আমাকে আদেশ দিলেন ০১ জুন থেকে স্কুলে যোগ দিতে। রাজি হয়ে গেলাম। আমার অজান্তে সেই মুহূর্তে আমার ভবিষ্যৎ কর্ম জীবন প্রবাহ নির্ধারিত হয়ে গেল। ক্লাস সেভেনে প্রথম পিরিয়ড। কৃষ্ট বাবুর নির্দেশমতো পড়ানোর বিষয়টি বাড়িতে ভালো করে পড়ে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কৃষ্টবাবু অনেকক্ষণ ক্লাসের পেছনে বসে আমার পরানো পর্যবেক্ষণ করলেন। পরে তার কামরায় ডেকে নিয়ে বললেন, তুই পারবি। প্রত্যেকটি ক্লাসের পড়ানোর বিষয়বস্তু বাড়ি থেকে পড়ে ভাল করে প্রস্তুতি নিয়ে আসবি। পড়ানোর চেয়ে পড়তে হবে বহুগুণ বেশি। তার এ বাস্তব উপদেশ চার বছর মেনে চলেছি।ছাত্র থেকে শিক্ষকে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হল। পড়াতাম প্রধানত ইংরেজি টেক্সট ও গ্রামার এবং ইতিহাস। ক্রমে পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা কমে আসলো, প্রয়োজন দেখা দিল বিষয়ের গভীরে গিয়ে আরো তথ্য সংগ্রহ করার। খ্যাতনামা লেখকদের বই-পুস্তক, রেফারেন্স, সাধারণ জ্ঞানের বই, বিশ্বকোষ ইত্যাদি কেনার জন্য কর্তৃপক্ষ অর্থ দিলেন। কেনা হয়েছিল অনেক বই।
বয়সে পাঁচ বছর ছোটদের ‘টুলু স্যার’ হওয়ার ব্যাপারটা ভারী উপভোগ্য লাগছিল। দিন কেটে যায়। একদিন এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হব- এমন আশা ক্রমশ মনের কোনে জমে উঠছিল। এমনটি হয় নাই। তবে জীবনে যা কিছু সাফল্য তার ভিত্তিমূলে রয়েছে ছাত্রদের পড়াতে গিয়ে নিজে পড়ার অভ্যাসটি। যে সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের সামাজিক মর্যাদা নিরুপিত হয় শুধুমাত্র ক্ষমতা, প্রতিপত্তি এবং ধনসম্পদ এর পরিমাণ দিয়ে, কিন্তু কি উপায়ে তা অর্জিত হলো বিচারের প্রয়োজন হয় না, সেখানে শিক্ষকের আদর্শ, জ্ঞান ও সততার মূল্য ও মর্যাদা কেউ দেয় না। তাই বাধ্য হয়েই অনেকে শিক্ষকতা পেশা হিসেবে নিতে পারেন না। তবু অনেকেই এই পেশায় থেকে যান। দীর্ঘদিন পাঠদান করে গভীর জ্ঞান ও পারদর্শিতা অর্জন করেন। ক্ষেত্রবাবু ‘অংকের জাহাজ’, কৃষ্ট বাবু ‘ইতিহাসের জাহাজ’, ঘটু মিয়া ‘গণিতের জাহাজ’, মোসলেম মিয়া ‘ভূগোলের জাহাজ, নামে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। পূর্বে যদুবাবু, উমেশ বাবুদের মত অনেক ‘ জাহাজ’ ভারত বিভাগের সময় স্কুল ছেড়ে চলে গেছেন।
তবে তাদের বিষয়ভিত্তিক অগাধ জ্ঞান ছিল মূলত পুঁথিগত ও তাত্ত্বিক। ভালো শিক্ষকের পাঠদান পরীক্ষায় ভালো মার্কস পেতে সহায়তা করতো সন্দেহ নাই। তারপরও কথা থেকে যায়, ছাত্ররা ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে সাফল্য লাভের জন্য কি শিক্ষকদের কাছ থেকে কোন বাস্তব ও প্রায়োগিক জ্ঞান, দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ পেয়েছে? তাদের সুপ্ত ও সহজাত প্রতিভা এবং মানসিক ও চারিত্রিক গুণাবলীর পরিচর্যা করে তা জাগিয়ে তুলতে, বিকশিত করতে পেরেছেন কি শিক্ষকরা? ছাত্র হিসেবে আমরা তা দেখি নাই। এর বহুবিধ কারণ ছিল। নবাবগঞ্জ তখনো এক অজপাড়া গা ঢাকা থেকে দূরত্ব মাত্র ২০ মাইল। বর্ষাকালে ৫০ মাইল নদীপথে ঘুরে যেতে সময় লাগতো ৫-৬ ঘন্টা লঞ্চে বা সারারাত গয়না নৌকায়। শীতকালে বিরম্বনা আরো বেশি। শোল্লা-পাতিলঝাপ পর্যন্ত পায়ে হাটা, তার পর বাকি পথ লঞ্চে, সব মিলিয়ে সাত-আট ঘন্টা। আধুনিক যুগের সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ও বিচ্ছিন্ন এক জনপদ নবাবগঞ্জ। এক কপি দৈনিক আজাদ স্কুলে আসতো তিনদিন পর। বিদ্যুৎ রেডিও কিছুই ছিল না। কয়েকটি পুস্তক ও কয়েকজন শিক্ষকের পাঠদান, এর বাইরে ছাত্রদের জন্য শিক্ষা লাভের আর কোন উৎসাহ ছিল না।
ছাত্রদের চিন্তার বিকাশ, বলার ক্ষমতা, যুক্তি-তর্ক দিয়ে নিজ ধ্যান ধারণা প্রতিষ্ঠা করার অনুশীলন আত্মবিশ্বাসী সফল মানুষ হওয়ার জন্য অত্যাবশ্যক। ডিবেটিং ক্লাবে অংশগ্রহণ এ সুযোগ এনে দেয়। তিনজন শিক্ষক- মহিউদ্দিন ভূঁইয়া, হীরালাল পাল, কামাল উদ্দিন এর সক্রিয় সহযোগিতায় নিয়মিত সাপ্তাহিক ডিবেটিং অনুষ্ঠান শুরু করলাম। আমাদের আবেদনে পরে স্কুল কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের সংস্কৃতি ফান্ডে চাঁদা আদায়ের ব্যবস্থা করে। নিয়মিতভাবে পরিচালিত সাপ্তাহিক ডিবেটিং সভায় বহু সংখ্যক ছাত্র স্ব উৎসাহে অংশ নিত। এদের মধ্যে নজিবুল্লাহ, মো. ওয়ারিশ, সেলিম খান, আতিয়ার রহমান, উইলিয়াম গমেজ, সফিউদিন মল্লিক, মোহাম্মদ মোসলেম, মদন মোহন বর্মন, রেজাউল হক, হরিহর পাল, মোশাররফ হোসেন, শামসুদ্দিন আহম্মদ, হুমায়ুন কবির- এমন অনেকে ছিল। ডিবেটিংয়ে অংশগ্রহণ তাদের পরবর্তী জীবনে কাজে লেগেছিল । ছাত্রদের একটি বাছাই করা দলকে শিক্ষা সফরে ঢাকার বিভিন্ন শিল্প কারখানা, বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ বেতার ও টিভি স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি ছিল ছাত্রদের জন্য বছরের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ। বড় মাপের কেউ আসতেন প্রধান অতিথি হিসেবে। প্রাক্তন ছাত্র জনাব আব্দুল ওয়াছেক প্রায়শই উপস্থিত থাকতেন। তিনি প্রতিবছর অনেক বই পুরস্কার ও ছাত্র বৃত্তি প্রদান করতেন। মনে পড়ে রাজা মিয়া, মুনির মিয়া, বিভূতি বক্সি, ডাঃ সফিউদ্দিন প্রমুখের কথা। তারা প্রতিবছর ছাত্র বৃত্তি ও বইপত্র পুরস্কার দিতেন। তবে আজকের মত সে সময়ও অল্প সংখ্যক অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সভায় উপস্থিত থাকতেন। কার্যত এই অনুষ্ঠান ছাত্র-শিক্ষকদের অনুষ্ঠান। সে সময়ে কোন প্রাক্তন ছাত্র সমিতি বা সংগটিত ছাত্র গোষ্ঠী ছিল না । বার্ষিক নাটক মঞ্চায়ন, রচনা প্রতিযোগিতা ও খেলাধুলা চলতো রুটিন মাফিক। আন্তঃবিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আমাদের স্কুল প্রায়শই চ্যাম্পিয়ন হত। কিন্তু তখনও স্কুলে ক্রিকেট খেলার প্রচলন করা সম্ভব হয় নাই। ছেলেদের খেলতে হত ফুটবল ও বেসবল। ফুটবল ও ট্র্যাক ইভেন্টে কয়েকজন ছাত্র জেলা ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পর্যায়ে কৃতিত্ব অর্জন করেছিল।
তখন স্কুল ইংরেজি ‘ইউ’ আকারের সাজানো তিনটি দালান ছিল। দুইটি ছিল টিনের ছাদ। বিদ্যুৎ সুবিধা হীন শ্রেণিকক্ষে গ্রীষ্ম-বর্ষার প্রচন্ড গরমে ঘেমে ছাত্র শিক্ষকদের ক্লাস করতে হতো। তবে বায়ু ছিল নির্মল, দূষণমুক্ত। কালের পরিবর্তনে এখন ছাত্ররা বৈদ্যুতিক পাখার নিচে ক্লাস করছে। তখন স্কুলের সম্মুখের দৃশ্য ছিল দৃষ্টিনন্দন। আজ তা ঢাকা পড়েছে কংক্রিটের স্টেডিয়াম ও বিপণীবিতানের আড়ালে। অবারিত মাঠের ওপর দিয়ে পূবালী বাতাস আর আসতে পারে না। কক্ষে বসে দেখা যায় না ইছামতির বুক দিয়ে উজান ভাটির লঞ্চের আনাগোনা, নেই প্রধান ফটকের দুপাশে কেরামতের চীনা বাদামের বাক্স জগদীশ দার মজাদার প্যারার দোকান।
তখন ছাত্রদের কোন ইউনিফর্ম ছিল না। তারা নানা রং ও ধরনের পোশাক পড়ে আসত। হাতে গোনা গুটি কয়েক ছাত্রী ছিল বিভিন্ন ক্লাসে। রাহেলা সর্বোচ্চ শ্রেণীতে ছিল, অন্যান্যদের মধ্যে নুরজাহান ওছিমা, শীলাবর্তী, রহিমা, অরুণাময়ী, সায়মা, বিলকিস ও ফরিদা ছিল। ছাত্রীদের শিক্ষার প্রতি বিশেষ যত্ন নেয়া হতো। ওরা সবার পরে ক্লাসে যেত, বের হতো সবার আগে – এটাই ছিল রেওয়াজ।
দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করে হেডমাস্টারের দায়িত্ব অত্যন্ত কৃতিত্ব ও বিরল সাফল্যের সঙ্গে পালন করে সর্বজন শ্রদ্ধেয় বাবু মোহন চক্রবর্তী ১৯৫৬ সনে অবসরে যান। এরপর থেকে স্কুলের পরিচালনা কমিটির সদস্যদের এবং শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যে নানা মতপার্থক্য ও মতবিরোধ দেখা দেয়। ভাবতে অবাক লাগে ‘রাজর্ষি’ শব্দের অর্থ ও ব্যবহারকে কেন্দ্র করে অহেতুক তুলকালাম কাণ্ড ঘটে, যার পরিনামে একজন দক্ষ ও যোগ্য প্রধান শিক্ষককে অসময়ে ও দুঃখজনক পরিস্থিতিতে বিদায় নিতে হয়েছিল। ১৯৬১ সনে স্কুল ছেড়ে আসার সময় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে আমাদের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের অন্ধ আজ্ঞাবহ কিছু এদেশীয় তাঁবেদারের অপচেষ্টা সফল হয়েছিল। আজ যখন সেখানেই রবীন্দ্রনাথ রচিত জাতীয় সংগীত ছাত্ররা গায়ে পরম মমতায় তখন সেদিনের ওই দুঃখজনক ঘটনাটি নতুন করে মনে পড়ে। ঘনঘন প্রধান শিক্ষকের আগমন-নির্গমন ঘটতে থাকে। আমি চার বছরে চারজন প্রধান শিক্ষককে পেয়েছিলাম। তা সত্ত্বেও মেট্রিক পরীক্ষায় নরেন ও নজিবুল্লাহ তাদের স্ব স্ব বছরের(১৯৫৮ ও ১৯৬২) বোর্ডের প্রথম ১০ জনের মধ্যে স্থান করে নিতে পেরেছিল। বস্তুত ছাত্র বিশেষের মেধা ও শ্রমের কারণে তা সম্ভব হয়েছিল। তারপরেও বলা যায় যে নবাবগঞ্জ থানার ( তখন উপজেলা নামকরণ হয় নাই) ছয়টি উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যে নবাবগঞ্জ স্কুলের মেট্রিক পরীক্ষার ফলাফল সাধারণত সবচেয়ে ভালো হতো। অন্য স্কুলের ছাত্ররা তোদের কাছে আসতো দুরূহ অংকের সমাধান, ইংরেজি অনুবাদ বা ইতিহাসের কোটেশন সংগ্রহ করতে। এসব ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষকদের সুনাম ছিল।
অপরিকল্পিতভাবে একদিন শিক্ষকতায় এসেছিলাম। কিন্তু ঘটনাচক্রে পরিকল্পনা নিয়ে এ পেশায় হয়েছে চার বছর। উঠতি বয়সে সমাজসেবা জনসেবামূলক কাজ করার স্পৃহা থাকে অনেকেরই, আমারও ছিল। কলেজে পড়াকালে গ্রামে লাইব্রেরী স্থাপন ও যুব সমিতি গঠন করে এ কাজে হাত দিয়েছিলাম। এটাই তখন আমার কাল হলো। গ্রাম ও প্রতিবেশী কিছু কুটির লোক আমার সঙ্গে অযথা শত্রুতা শুরু করে। চাঁদা তুলে ফৌজদারী মামলা ঢুকে দিলেন, আসামী হয়ে আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলো সাড়ে তিন বছর। চার বছর বাধ্য হয়েই গ্রামে অবস্থান করতে হলো। দীর্ঘায়িত হল আমার শিক্ষকতার জীবন।
অবশেষে বিদায়ের ঘন্টা বাজিল। ১৭ মে ১৯৬১ সালে স্কুল ছেড়ে, ছাত্রদের ছেড়ে জীবন চলার নতুন পথে পা বাড়ালাম। বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন হলো ঘটা করেই। ছাত্ররা হাতে তুলে দিলো ইংরেজি সাহিত্যে এম এ ক্লাশের সিলেবাস এর পুরো সেট বই উপহার স্বরূপ। আমার বাড়ির ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে সেসব উপহার আমাকে নিয়ত মনে করিয়ে দেয় শিক্ষকতার চারটি বছর, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়।
মাহমুদ আলী খান টুলু: প্রাক্তন শিক্ষক, নবাবগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়।