স্বদেশে প্রবাসে জীবনের দ্বৈরথে

জীবন এক চলমান স্রোত। সেই স্রোতের টানে মানুষ কখনও স্বেচ্ছায়, কখনও প্রয়োজনে, কখনও বা বাধ্য হয়ে অতিক্রম করে ভৌগোলিক সীমানা, হয়ে যায় প্রবাসী… চিহ্নিত হয় অনাবাসী হিসেবে। জীবিকা, নিরাপত্তা, শিক্ষা কিংবা উন্নত ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় যখন কেউ জন্মভূমি ছেড়ে অচেনা ভূখণ্ডে পা রাখে, তখন তার যাত্রা কেবল স্থানান্তরের নয়—তা এক গভীর মানসিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের সূচনা। প্রবাসের মাটিতে প্রথম পদচিহ্নের সঙ্গে যুক্ত থাকে অনিশ্চয়তা, প্রত্যাশা ও অন্তর্লীন শঙ্কা। নতুন সমাজ, নতুন ভাষা, নতুন নিয়ম—সবকিছু মিলিয়ে এক অপরিচিত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। তবু মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা বিস্ময়কর। অল্পদিনেই সেই অপরিচিত ভূখণ্ডই হয়ে ওঠে কর্মভূমি, জীবন সংগ্রামের ক্ষেত্র, স্বপ্নপূরণের সম্ভাব্য ঠিকানা। কিন্তু স্বদেশ? সে তো অন্তরের গভীরে গেঁথে থাকা শেকড়, অস্তিত্বের ঠিকানা!  হাজার হাজার মাইল দূরত্ব সত্ত্বেও মা-মাটি-মানুষের স্মৃতি বুকের অন্তঃস্থলে প্রোথিত থাকে অবিচ্ছেদ্য সত্যের মতো। জীবনযাপনের সকল অনুসঙ্গ, ভাষা-সাহিত্য-সংকৃতি, ঋতু-প্রকৃতি-নদী জল—  সবকিছু  মিলিয়ে জন্মভূমি এক অন্তর্লীন ভূগোল, যা আমাদের হৃদয়ের মানচিত্রে অমোচনীয়।

জীবন জীবিকার টানে স্বদেশ ছেড়ে যাদের প্রবাসের মাটিতে গড়ে তুলতে হয় এক ভিন্ন আবাস এবং ভেসে যেতে হয় প্রাত্যহিকতার আবর্তে, তারা দেশ থেকে দূরে হলেও বুকের গভীরে ঠিকই ধারণ করে থাকে স্বদেশ।  দেশের  প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত মনটা উড়ে বেড়ায় স্বদেশের আকাশে। মানুষের আশা-আকাঙ্খা-স্বপ্ন এক চিরায়ত মানসিক চাহিদা। জন্ম আর মৃত্যুর মাঝে আমাদের যে চলমান অভিযাত্রা, তা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে, তাই স্বদেশ-প্রবাসের জীবনধারণে এ এক অন্তর্লীন দ্বৈরথ। আমাদের দ্বিচারিনী মন যেমন উড়ে বেড়ায় দেশের সীমানায়, তেমনি আমাদের বেঁচে থাকতে হয় বর্তমানের দেয়াল ঘেঁষে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে প্রবাসের  আঙিনায়।

প্রবাসভূমিতে নিজের জীবনকে গড়ে তোলার সাথে স্বভাবাভিকভাবেই সম্পৃক্ত হয়ে যায় নিজের সমাজ, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্য ইত্যাদি। বুকের গভীরে যা প্রোথিত হয়ে যায় জন্মের সাথে, তার বন্ধন থেকে বিছিন্ন হওয়া যায় না কখনো। বিগত শতবর্ষে অভিবাসন প্রক্রিয়া সহ বাঙালি পাড়ি জমিয়েছে  বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, গড়ে তুলেছে আপন আবাস, এগিয়েছে স্বপ্নপূরণের প্রত্যাশায়। মিশ্র সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রতিকূলতা কাটিয়ে নিজের স্বকীয় সত্তাকে জাগ্রত রেখে প্রবাসের মাটিতে জীবন যাপন এক সংগ্রামই বটে।  বিগত বেশ কয়েক দশকে যেমন বিশ্বায়নের পথ ধরে জীবন যাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এসেছে বিরাট পরিবর্তন, তেমনি প্রবাসীদের জীবনযাত্রাও নিয়েছে নানা মোড়। দেশ-প্রবাসের তুলনা নয়, দীর্ঘ সময় প্রবাসের মাটিতে জীবনযাপনের  পথ ধরে যেসব বিষয়গুলো প্রত্যক্ষ করেছি,  তার আলোকে কিছু সহভাগিতা করার প্রত্যাশায়ই সংক্ষিপ্ত পরিসরে এই প্রয়াস। 

সার্বিক প্রেক্ষাপটে দেশ এবং প্রবাসের ক্ষেত্রে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। কিন্তু আমাদের দ্বৈত জীবনধারায় স্বদেশের বৃত্ত পেড়িয়ে  জীবনের উত্তরণের পথে এগিয়ে যেতে যেতে দেশের যাপিত জীবনের স্মৃতিগুলো আমাদের প্রবাসী জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়, অনুরণিত হয় বুকের গভীরে শেকড়ের টানে। এটাই দেশের প্রতি আমাদের ভালোবাসার টান, নাড়ীর বন্ধন! এগিয়ে যাওয়াই  জীবনের ধর্ম, গ্রহণ করাই অভিযাত্রার প্রথম সোপান, তাই প্রবাসের মাটিতে আমরা ধারণ করে আছি স্বদেশকে- এটাই আমাদের আনন্দ ও আত্মপরিচয়ের অহংকার!

 মানুষের জীবন মূলত: আকাঙ্ক্ষার অভিযাত্রা। নানা চড়াই উৎরাই পেড়িয়ে উন্নত জীবনের সন্ধানে মানুষ পাড়ি জমায় প্রবাসের মাটিতে, আর তাদের অভিযাত্রা শুধু তাদের নিজেদের জন্য নয়, তাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নও। সন্তানের শিক্ষা, নিরাপত্তা, সামাজিক প্রতিষ্ঠা—এসবই হয়ে ওঠে প্রবাস জীবনের অন্যতম লক্ষ্য ও প্রেরণা। সেই প্রেরণা মানুষকে ক্লান্তিহীন পরিশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে। আশা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষের স্বভাবজাত শক্তি; ব্যক্তি বিশেষে তার মাত্রা ভিন্ন হলেও তার উপস্থিতি সর্বজনীন। সংক্ষিপ্ত জীবনের পরিসরে মানুষ তার সামর্থ্য, স্বপ্ন ও সীমাবদ্ধতার সঙ্গে এক নিরবচ্ছিন্ন সমঝোতার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয় জীবনের পথে, যা প্রবাসী সমাজের প্রগতির পথে এক অনিবার্য অভিযাত্রা।

প্রবাসে জীবন গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় সংস্কৃতি ও শেকড়ের প্রশ্নটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জন্মসূত্রে প্রাপ্ত ঐতিহ্য, ভাষা ও মূল্যবোধ মানুষকে গড়ে তোলে স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার এক নিবিড় বন্ধনে। নতুন দেশে, নতুন সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতে গিয়ে কেউই সেই ভিত্তিকে, আত্মপরিচয়কে  সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করতে পারে না কখনই। বরং দ্বৈত পরিচয়ের এক জটিল কিন্তু সমৃদ্ধ বাস্তবতা গড়ে ওঠে—একদিকে স্বদেশচেতনা, অন্যদিকে প্রবাসী নাগরিকত্ব,  এই দ্বৈততার ভেতরেই নিহিত থাকে অভিবাসী জীবনের সৌন্দর্য ও সংকট। গত শতাব্দীতে বিশ্বায়নের প্রবাহে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অভিবাসন এক বৈশ্বিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বাঙালি সমাজও তার ব্যতিক্রম নয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে অনাবাসী বাঙালিরা প্রবাস ভূখণ্ডেই গড়ে তুলেছে নিজেদের সমাজ, সংগঠন, সাংস্কৃতিক পরিসর- যেন সৃষ্টি হয়েছে খন্ড খন্ড বাংলাদেশ। মিশ্র সংস্কৃতির ভেতর নিজস্ব পরিচয় অটুট রাখা সহজ নয়; কিন্তু এই সংগ্রামই অভিবাসী জীবনের আত্মপরিচয়ের মর্যাদা। পরিবর্তন অনিবার্য—তাকে অস্বীকার নয়, বরং গ্রহণ করাই প্রগতির  লক্ষণ। আর সে অভিযাত্রায় অগ্রসরমান আমাদের অনাবাসী বাঙালি সমাজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। স্বদেশের প্রতি অকৃতিম ভালোবাসা অন্তরের গভীরে প্রোথিত হয়ে যাবার যে আনন্দ, তা যে কোন মূল্যে বিজর্সন দেয়া সম্ভব নয় কোনক্রমেই।

প্রবাসের জীবন যেমন সম্ভাবনাময়, তেমনি প্রতিকূলতায় আচ্ছন্ন। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুবিধার বিনিময়ে মানুষকে মেনে নিতে হয় সময় নিয়ন্ত্রিত, প্রায় যান্ত্রিক জীবনযাত্রা। প্রবাসের মাটিতে জীবনযাপন একদিকে যেমন সুখকর নানা  সুযোগ সুবিধা এবং উত্তরণের নানা অনুষঙ্গের অবাধ প্রাপ্তি ও  সহজলভ্যতার কারণে, তেমিন সংগ্রামও কম নেই। সকাল আর সন্ধ্যার মাঝে বিস্তৃত যে সময়টুকু, সে সময়টুকু জীবিকার টানে হয়ে উঠে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। প্রবাসের প্রাপ্তিগুলো যেমন বেশীর ভাগ মানুষেরই জীবনকে গড়ে তোলে স্বপ্নপূরণের স্পর্শে এক উন্নততর জীবনের ছোঁয়ায়, তেমনি অনেকের জন্য যান্ত্রিকতার যাঁতাকলে এমনি জীবনযাপন বোঝা দাঁড়ায় সময়ের সাথে সাথে, আর কোন গত্যন্তর নেই বলে এগিয়ে যেতে হয় সামনের দিকে। দায়ভার এড়ানোর কোন উপায় নেই বলে বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয় চলমান পরিস্থিতির মাঝে। সবার পরিবেশ-পরিস্থিতি এক নয়, তবে বেশির ভাগ মানুষকেই একটা সময় এ অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়…..  ক্লান্তির বোঝাটা প্রকাশ না করতে পারলেও সত্যকে স্বীকার করার শক্তি অনেকেরই নেই, আর সত্যকে উপেক্ষা করাটা সমীচীনও নয়। নিজেদের  চাওয়া-পাওয়া পূরণ হোক বা না হোক, এক সময় আমাদের মনে জেঁকে বসে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। তাই সংগ্রামের এক  স্তর থেকে আমাদের ধেয়ে চলতে হয় আরেক সংগ্রামে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণে আত্মত্যাগ হয়ে উঠে প্রবাসী জীবনের এক অঘোষিত বাস্তবতা। সবার সব স্বপ্ন পূরণ হয় না, এক সময় লালিত স্বপ্নগুলো শুকনো পাতার মতো ঝরে পরে, আমরা অনুভব করতে শুরু করি আমাদের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা-   সেটাই হয়ে দাঁড়ায় নির্মম বাস্তবতা! নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন সন্তানদের মাধ্যমে পূরণের আকাঙ্ক্ষা কখনও আশীর্বাদ, কারো কারো জন্য আবার কখনো কখনো  বোঝা। এটিই বাস্তবতা—কঠিন, কিন্তু অনিবার্য। অন্যদিকে, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের প্রেক্ষাপট একটু  ভিন্ন। তাদের জন্য সুযোগের পরিসর বিস্তৃত এবং ব্যাপক; শিক্ষাব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও সামাজিক কাঠামো তাদের লক্ষ্য অর্জনে ভীষণভাবে সহায়ক। নিজেদের গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় তারা স্বাভাবিকভাবেই মূলধারার অংশ হয়ে ওঠে।  তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজের জীবনের লক্ষ্য স্থির করে তা অর্জন করা খুবই সহজ প্রবাসের মাটিতে। পূর্ব পুরুষ বা শেকড়ের টানে নিজেদের পিছু ফিরে দেখতে হয় না, স্বপ্নের টানে এগিয়ে চলে বাধাহীনভাবে লক্ষ্য অর্জনের পথে  এবং তা সম্ভবও বটে। সময়ের ব্যবধানে নতুন প্রজন্মের কাছে শেকড়ের স্মৃতি ম্লান হয়ে যায়, এটা ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম। একটি অভিবাসী সমাজ সম্পূর্ণভাবে নতুন সমাজে আত্মস্থ হতে বহু সময়ের প্রয়োজন হয়। এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করা যায় না; বরং তাকে বুঝে, মূল্যায়ন করে, ভারসাম্য রক্ষা করাই প্রজ্ঞার পরিচয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী একটি অভিবাসী সমাজের মূলধারায় মিশে যেতে অন্তত: ১৫০ বছর সময় লেগে যায়, আমাদের অভিবাসী বা অনাবাসী বাঙালি সমাজেরও সেই যাত্রা অব্যাহত। এক সময় বাঙালি অভিবাসী সমাজের উত্তরসূরিদের কাছে তাদের পূর্ব পুরুষ হয়ে যাবে প্রাচীন ইতিহাসের মতো, একটা সময় তা সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ন হয় যাবে, মুছে যাবে-  এটাই মাবব স্রোত, এটাই বাস্তবতা, এটাই ভবিতব্য।

স্বদেশ চেতনা গভীরভাবে আমাদের হৃদয়ে প্রোথিত আছে বলেই প্রবাসের মাটিতেও আমরা আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই আমাদের শেকড়কে, আমাদের চেতনার সবুজ চত্বরে বাংলার মাটি-জল-বায়ু। একথা সত্যি আমাদের যে দ্বৈরথে পথচলা, সেখানে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণরূপে  আঁকড়ে ধরা আমাদের সম্ভব নয়, কিন্তু দেশের একজন স্থায়ী অভিবাসী হিসেবে, নাগরিক  হিসেবে এদেশের প্রতি আমাদেরও দায়িত্ব আছে, মূলধারায় আমাদেরও অংশগ্রহণ প্রয়োজন এবং এটা আমাদের কর্তব্য। তবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রবাসী সংস্কৃতির সাথে মিশে গিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করাটাই শ্রেয় এবং  কিন্তু তা নিজেদের পূর্ব পুরুষের ইতিহাস বা শেকড়ের ইতিহাস ভুলে নয়। যেহেতু প্রবাসের মাটিতেই তাদের জীবন যাপন করতে হবে, তাই সেই দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ এবং মূলধারায় অংশগ্রহণ ও ভূমিকা রাখা একান্ত জরুরী  এবং তা হচ্ছেও কিছু মাত্রায়। প্রবাসী বাঙালি অধ্যুষিত প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে রয়েছে নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, তারা চর্চা করে যাচ্ছে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির, গড়ে তুলছে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ছোঁয়ায়,  এটা প্রবাসের মাটিতে আমাদের সমাজের একটি বিশেষ ইতিবাচক ভুমিকা।  তরুণ প্রজন্মের হাতে আমাদের ইতিহাস, আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য তুলে দেয়ার গুরু দায়িত্ব আমাদের সমাজের, সম্মিলিত প্রয়াসেই  শুধু সম্ভব আমাদের তরুণ প্রজন্মের হাতে এসব তুলে দেয়া এবং ওদের দ্বারাই সম্ভব ভবিষ্যতের বলয়ে তা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রত্যয়ের সাথে।

নানা সাংগঠনিক আয়োজনে প্রবাসের মাটিতে যেমন হচ্ছে সাংস্কৃতিক চর্চা, পালন করছে জাতীয় দিবস ও ঐতিহ্যগুলো, তেমনি হচ্ছে সাহিত্যের চর্চাও। সাহিত্য, সংগীত, নাট্যচর্চা, বইমেলা, ভাষা শিক্ষা—এসব উদ্যোগ কেবল নস্টালজিয়ার বহিঃপ্রকাশ নয়; এগুলো প্রজন্মান্তরের সেতুবন্ধন। প্রবাসী লেখক ও শিল্পীরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্ব পরিসরে তুলে ধরছেন—এ এক গর্বের বিষয়। প্রবাসের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক শক্তিশালী লেখক, যাঁরা আমাদের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করছে, এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে….. এটাও প্রবাসী সমাজের একটি বিরাট অবদান আমাদের বাংলা সাহিত্যে। তাঁরা প্রতি বছর একুশের বই মেলায় নিজেদের বই প্রকাশ করছে, প্রবাসের মাটিতে আয়োজন হচ্ছে বই মেলার-  এটা সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।

মূলধারার রাজনীতি ক্ষেত্রেও আমাদের বাঙালি প্রবাসী সমাজের পদচারণা এখন আগের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে যাচ্ছে, এটা একটি আশাব্যঞ্জক দিক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই পথ অনুসরণ করে মূলধারায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি নিশ্চয়ই দেশের কল্যানে ভূমিকা রাখতে পারবে বলে বিশ্বাস করি।  এছাড়াও সামাজিক বলয়ে নিজেদের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরী করার লক্ষ্যে চলছে নানা প্রয়াস, কিন্তু আরেকটি বিষয় এড়িয়ে যাবার উপায় নেই, আর তা হলো প্রবাসের মাটিতেও সমাজের ভেতরে মতপার্থক্য, বিভক্তি কিংবা আত্মকেন্দ্রিকতার প্রবণতা একেবারে অস্বীকার করা যায় না। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভিন্নমত কখনও অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব সৃষ্টি করে, অনাকাঙ্খিত ঘটনাও ঘটে যায় অনেক সময়। তবুও সব কিছু মিলিয়ে চলছে প্রবাসী জীবন, ভালো-মন্দ, চড়াই-উৎরাইয়ের মাঝে….. আগামীর বলয়ে এমনিভাবেই চলবে, সেটাই বাস্তবতা। তবে স্বদেশ আর প্রবাসের মাঝে যোগসূত্র রচনার ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আরও সচেতন হয়ে আরো জোরদার ভূমিকা রাখার জন্য এগিয়ে আসতে  হবে যেটুকু সম্ভব, সেটুকুই যেন আমরা আন্তরিকতার সাথে করতে পারি, সেটাই প্রত্যাশা।

আমরা স্বদেশের সন্তান, প্রবাসের নাগরিক, আবার একইসঙ্গে পৃথিবীরও অংশ। এই বিশ্বজনীন চেতনায় এবং মানবিকতার স্পর্শে আমাদের নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে-   জাতিগত পরিচয় কিংবা ভৌগোলিক অবস্থান নয়, মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই চূড়ান্ত মূল্যবোধ। আমরা যেন শুধু প্রবাসী বাঙালি অনাবাসীই নয়,  নিজেদের একজন বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলে এক জন মানবিক মানুষ হয়ে উঠি, মানুষের পাশে দাঁড়াই, মানুষের সুখে-দুঃখে সহভাগী হয়ে সহমর্মিতার মননশীলতা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি, সেটাই হোক আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে স্বদেশ-প্রবাসের দ্বৈরথে আমাদের জীবন যাপনের মন্ত্র! আমাদের মাতৃভূমি হোক আমাদের শেকড়, আমাদের কর্মভূমি হোক আমাদের শক্তি, আমাদের মানবিক কর্ম হোক আমাদের মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয়ের প্রত্যয়! এ প্রসঙ্গে দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা যায় যে রবীন্দ্রনাথের দর্শনে মানবতা কোনও বিমূর্ত ধারণা নয়; তা একটি সক্রিয় চর্চা। আজকের বিশ্বায়নের যুগে, যখন বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা প্রায়ই মানবিকতার চেয়ে জোরালো হয়ে ওঠে, তখন রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজনীন চেতনা নতুন করে প্রাসঙ্গিক, তাঁর আহবান আমাদের মনে করিয়ে দেয়— মানুষে মানুষে সম্পর্কের সেতুবন্ধনই সভ্যতার আসল ভিত্তি। আমাদের প্রবাসী জীবনে, বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে সহাবস্থানের বাস্তবতায়  রবীন্দ্রদর্শন আমাদের শেখায় ভিন্নতাকে সম্মান করতে, বৈচিত্র্যকে আলিঙ্গন করে বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠতে,  তাইতো তিনি বলেছেন :

“পৃথিবীকে আমি আপন করে নিতে চাই, কেবল আমার দেশকে নয়।”

লেখক: স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতাকালীন সেক্রেটারি, অগ্রদূত ছাত্র সংগঠন। বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী।