মা মেয়ের খুনসুটি

– হ্যাঁ মা হ্যাঁ। তারপর কি?

– আর বলিস না, জানিস একটুও সময় পাই না। শুধু ফোন আর ফোন। এই নিউ ইয়র্ক, মেরিল্যান্ড, এই  কানাডা, এই দুবাই, এই অনলাইনে এটা ওটা নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয় সারা দিনরাত। সময়টা যে কোন দিক দিয়ে চলে যায়! আমি ঠিক মত খাবার সময়টুকুও পাই না।

– হ্যালো মা। তুমি কি সব বলছো? কার সাথে কথা বলছো, আমাকে দাঁড় করিয়ে?

– ওহ মিতু! তুই খাস আমাকে জ্বালিয়ে। বিয়ের আগে এতো করে বললাম, রান্নাটা একটু ভালো মত শিখে নে। তা’না এখন সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপার কানাডা থেকে ফোনে তোকে রান্না শেখাতে হচ্ছে।

– মা, তুমি না একটু সুযোগ পেলেই জ্ঞান দিতে শুরু করো। এখন বলো কি করতে হবে?

– কি করতে হবে মানে?

– তোমার কথা মত কড়াইতে তেল লবন পেঁয়াজ দিয়েছি। পেঁয়াজ পুড়ে কালো হয়ে গেছে। এখন কি দেবো?

– শোন। ওটা নামিয়ে ফেল। পোড়া পেঁয়াজে পোলাও ভালো হবে না। হ্যাঁ। তুলসী কি যেন বলছিলি?

– মা। মা। তুলসী পিসি ফোন দিয়েছে বুঝি? তুমি কয়টা ফোনে কথা বলছো? আর এদিকে আমার রান্নার বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছ। পেঁয়াজ পুড়ে কালি হয়ে গেছে। ওদিকে বাথরুমে আমার কত কাপড় ভিজিয়ে রেখেছি, ধুতে হবে। হ্যালো। মা।

– হ্যাঁ হ্যাঁ। তুই ঠিকই বলেছিস। যা দিনকাল পড়েছে। জানিস দেশে এখন বিয়ের ধুম পরে গেছে। রোজ একটা দুইটা বিয়ে লেগেই আছে। যাক, পরে আবার তোর সাথে কথা বলবো। অনেক কথা আছে তোর সাথে। তুলসী ভালো থাকিস। দশটা বাজে রে। আমার আবার হাউ টু লার্ন জাপানিস ল্যাঙ্গুয়েজের ক্লাস আছে অনলাইনে। জানিস। অনলাইনে ক্লাস চলার সময় আমি না, কারো ফোন রিসিভ করি না।

– তাই নাকি? বেশ ভালো।

– আরে না। আমার আবার বুঝতে একটু সময় লাগে। বুঝিসই তো বিদেশী ভাষা। তাও আবার জাপানিস। ওরা যা বলে আমি সব টেপ করে রাখি। পরে শুনে শুনে শিখি।

– তোর জামাই দুবাই। তুই যাবি জাপান। মেয়ে কানাডা। বাহ্, তোরা তো দেখছি ইন্টারন্যাশনাল ফ্যামিলি হয়ে যাবি। 

– দুর কি যে বলিস না। রাখ এখন দেখি মেয়েটা কি করছে। মেয়েটা পোলাও রান্না করবে বলে লাইনে ছিল। দেখি এখনও আছে কি না। যে মেয়ে  আমার। হ্যালো। একি! ওর ফোন তো সুইচ ওফ লাগছে। নাহ! কি যে করি মেয়েটাকে নিয়ে! দশটায় আবার আমার জাপান ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাস। হাতে আর পনেরো মিনিট সময় আছে। মিতুর ফোন সুইচ অফ জামাইকে একটা ফোন দিয়ে দেখি। জামাই কি এখন ঘরে আছে? দেখি ফোন দিয়ে।

– হ্যালো। 

– হ্যালো। মা। আমি জন বলছি।

– হ্যাঁ। মিতু পোলাও রান্না করছিলো। আমি তখন তোমার তুলসী পিসির সাথে কথা বলছিলাম। ওর কি রান্না হয়ে গেছে?

– মনে হয় না। রান্না ঘর থেকে পোড়া পোড়া গন্ধ পেয়েছি। মিতুকে দেখলাম রান্না ঘর থেকে বন বন করতে করতে বের হয়ে এখন কাপড় ওয়াশ করছে। কেন মা?

– রান্না করেনি?

– মনে হয় না। আমাকে বললো খাবার আনতে। তাই আমি টেস্টুরেন্টে দিকে যাচ্ছি।

– ঠিক আছে। এখন রাখি। আমার আবার জাপান ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।

– হ্যাঁ মা। ঠিক আছে। বাই।

– হ্যাঁ। বাই।

দুদিন পর মিতু মাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করে।

– মা তুমি তো আমাকে খুব পোলাও রান্না করা শেখালে; আজকে ভাজাকারী রান্না করবো। যদি ঠিক মত না বলো। তবে তোমার খবর আছে।

– আমার কি দোষ। ঐদিন আমি তারপর তোকে কত ফোন দিলাম। তুই তো রাগ করে ফোনের সুইচ অফ করে রেখেছিলি। 

– রাখবো না। তুমি ঐ তুলসী পিসির সাথে কথা বলো গিয়ে। 

– শোন মা, রাগ করিস না। তোরই তো পিসি। যাক, আজকে কি রান্না করবি বল? 

– যা-ই করি তোমার আরেক ফোনের সুইচ অফ কর আগে; নইলে আমি তোমার সাথে কথাই বলবো না।

– আচ্ছা ঠিক আছে। করছি। এই নে অফ করে দিলাম। বল এখন কি রান্না করবি?

– শোন, তোমার জামাই বাজার থেকে বাংলাদেশের মত একটি আইড় মাছ নিয়ে এসেছে। বলছে এটা দিয়ে ভাজাকারী রান্না করতে।

– ভাজাকারী? এতো খুব সোজা রে। একটু রাখ, দেখি কে যেন ফোন করেছে! ওহ! তোর পিলু মাসি ফোন দিয়েছে। বেশী না, দুইটা কথা বলে রেখে দিচ্ছি।

– মা তোমাকে বললাম আরেকটা ফোনের সুইচ অফ করে রাখতে, আর তুমি! আশ্চর্য!! এখন পিলু মিলু মাসির সাথে কথা বলবে? পিলু মাসি তো কথার ট্রেন। 

– ছিঃ মুরুব্বিদের সম্বন্ধে এমন কথা বলতে নেই। একটু রাখ। হ্যাঁ। পিলু কিরে কি খবর? কতদিন পরে মনে পড়লো বোনকে। তোরা তো মেরীল্যান্ডে খুব মজায় আছিস।

– দিদি মজা কাকে বলে এসে দেখে যাও। বরফে ঢেকে আছি। খুব করুণ অবস্থা আমাদের। দাঁড়াও তোমাকে ঘরের বাহিরের দৃশ্যটি দেখাচ্ছি। দেখ বরফের পাহাড় হয়ে আছে। আমাদের একটা গাড়ী বরফের নিচে চাঁপা পরে আছে। আরেকটা খুব কষ্টে পরিষ্কার করে রনি বাজারে নিয়ে গেছে। ঘরে রান্নার কিছু নাই। তাই বাধ্য হয়ে রনি বললো, দাঁড়াও আমি বাজার থেকে আসছি। তা তোদের ঐখানকার খবর কি?

– আর বলিস না। সামনে নির্বাচন। জিনিস পত্রের দাম দ্বিগুন বেড়ে গেছে। দেখ মেয়ে আবার রিং করছে। ওহ! মাকে একদম অস্থির করে ফেলছে। আজ রাখি রে। মিতু ফোন দিয়েছে। যে মেজাজি মেয়ে। ফোন রিসিভ না করলে খবর হয়ে যাবে। 

– আচ্ছা ঠিক আছে। আমি পরে আবার ফোন করবো দিদি। বাই।

– আচ্ছা। বাই। হ্যালো, মিতু। ফোন কেঁটে দিয়েছে। মেয়েটা এতো ছ্যান-ভ্যানা কি বলবো।

মিতুকে আবার ডায়াল করে মিতুর মা রমা।

– হ্যালো। 

মিতু ফোনটা রিসিভ করে মাকে একটু মেজাজে বলে, 

– পিলু মাসির সাথেই কথা বল। আমি এখন কথা বলতে পারবো না।

– মিতু শোন, কি যেন বলছিলি? ভাজাকারী?

– হ্যাঁ। ভাজাকারী। শোন মা, আমার কথা বলার সময় নেই। তুমি আমার মেসেজে ভাজাকারী রান্নার রেসিপিটা লিখে পাঠাও। আমি পরে পড়ে দেখে নেবো।

এই কথা বলেই মিতু তার ফোন কেঁটে অন্য কাজে চলে যায়। মিতুর মা মিতুকে বেশ কয়েক বার হ্যালো হ্যালো বলেও আর ফোনে পায় না।

লেখকের প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: সাতাশ রঙের গল্প