পাঠাগারে বসে ও অন্যান্য কবিতা
পাঠাগারে বসে
সহাস্য সমাবেশ বসেছে আজ পাঠাগারের টেবিলে।
বইগুলো নিরব শ্রোতা হয়ে ঠোঁট টিপে হাসছে,
প্রায়শই সেই হাসিতে মিশে আছে প্রহসনের দীর্ঘশ্বাস।
উইয়ের ভয়ে শেলফ থেকে নেমে এসেছে মাটিতে,
মোটা ধুলো পরেছে চালু রাস্তার পাশে থাকার বদৌলতে।
পাতাগুলো কিন্তু বেশিরভাগই কড়কড়ে নতুন নোটের মতন,
সাথে ফাঙ্গাসের ঘ্রাণ নির্লজ্জের মতো বলে দেয়-
কত অজস্র রাত নির্ঘুম কেটেছে তার পাঠকের পথ চেয়ে।
বুক পয়েন্টার সরিয়ে পাতা ওল্টানোর শব্দ নেই,
বরঞ্চ মুড়ি মাখার আসর বসেছে পড়ার টেবিলে।
সিঙাড়ার পোড়া তেল দাগ ফেলেছে
টোকোন ঠাকুরের কবিতার বইয়ে।
রাজনীতি থেকে আয়ুর্বেদিক, কর্পোরেট থেকে বেকারত্ব –
আলোচনার অভাব নেই,
কেবল বইগুলো পরে আছে পড়ার অভাবে।
গতকাল হয়েছিল ভাবুক মজিদের মুখোশ উন্মোচন,
আজ হচ্ছে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যবচ্ছেদ।
বইগুলো এখানে নিরব শ্রোতা,
নিরবতার গুঞ্জনে ভারী করছে বাতাস।
এখানে কাঁচ-কাঠ- টিনের ব্যারিকেড ভেঙে
দেয় অট্টহাসির শব্দ,
চিকুনগুনিয়ার রোগীর মত গিঁটে গিঁটে ব্যথা নিয়ে
আধা পঙ্গু হয়েছে বইয়ের শব্দ।
শব্দ আর শব্দ- এই ব্যবধান ভাঙতে
জোর করে কিছু পংক্তির আবৃত্তি করে সেই মেয়েটি ,
যে নিজের কবিতা ভালোবেসে
সমাজচ্যুত হয়েছে সপ্তাহ কয়েক আগে।
বই উৎসব যেখানে ভেসে গেছে
শ্রাবণের মেঘ ধোয়া পানিতে,
সেই পাঠাগারে আমাদের সন্ধ্যা কাটে
বই পড়া ব্যতীত সকল আনন্দ আয়োজনে।
সেতু
মাইলস্টোন স্কুল ট্রাজেডি নিয়ে লেখা কবিতা
আমি সব দেখে শুনে চক্ষু মুদিয়া তোমারে খুঁজছি প্রভু,
শিশু ছাড়া আর অন্য কিছু ভাবিনি তোমায় কভু।
তোমায় ভাবিয়া শিশুর চরণে প্রতি প্রাতেঃ ঠেকি শির,
আজ কেন তবে পাঠশালাতে জমেছে শবের ভীড়?
কেন কেন বল, পিতা মাতা আজ এতিম কাঙাল পথে,
কিসের হিসাব মিলালে বল স্বর্গদূতের সাথে !
অতটুকু আমার বুকের মানিক- কাটিনি এখনও নাড়ি,
সর্বজ্ঞানী তোমার জ্ঞানের থলে আজ খুঁজি ঝাড়ি।
তোমার বাগে এতই দৈন্য- পাখি আর তাজা ফুলের?
দেখ দেখ প্রভু আমার রতন গলে দিল শিখা আগুনের!
দেখ না প্রভু কিছুই তুমি, শোনো না তো হতের ক্রন্দন,
কিরা কেটে মুখ ফেরাবো মড়া ছিঁড়ে অমলিন বন্ধন!
কীবা আর করি প্রাণের প্রভু, কীবা মাঙো তুমি পাষাণ,
মাফ তো করনি – ফল তো ভাবনি ,পোড়া বাসে ম ম ময়দান।
আহা প্রভু, আহা, দেখি দেখ কি,
আর কটা পদ ছুটি,
আমায় ময়না ডাকিছে আমারে, দু’দিকে বাহু মেলিয়া দু’টি।
আমি আর জাদু মিলিবো আবার, ত্বরা করি আমি যাই,
প্রভু মাঝখানে সেতু হয়ে শোও, আর তো সবুর নাই।
প্রিয় কবি
হেলাল হাফিজ স্মরণে
তোমার কবিতা দিয়ে একটা শাড়ি বুনে ফেলি নাহয়!
শোক প্রকাশ বড্ড বেশী সেকেলে, কিছুটা বেমানান।
শত বারের ব্যর্থ চেষ্টা তোমার পংক্তিগুলো আবৃত্তি করবার,
জোর শোর প্রস্তুতি পুরস্কার জিতবার!
তোমাকে কিন্তু খুঁজিনি একবারও,
আর আজ, নীল দেয়াল জুড়ে তোমার জন্য লাল শোক।
তোমার কথায় যুদ্ধটা মিশে গেছে
দেশ আর যুবকের অস্তিত্বের টানাপোড়েনের মাঝে,
স্বরে কতটা অধিকার রাখা যায়,
কতটা নিয়ন্ত্রণে তোমার আবেগকে ছুঁতে পারি বলতো?
হৃদয় নিংড়িয়ে কষ্ট বিলাতে চেয়েছ কবি,
শ্রান্ত ন্যুজ্ব ফেরিওয়ালার মতন।
কন্ঠ নিখুঁত করে বিচারকের মন জিতেছি,
তোমাকে কিন্তু বুঝতে চাইনি।
আজ তুমি একাকী মেঝেতে পড়ে,
আর আমি দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাই।
তোমার সম্রাজ্ঞী হবার লোভ আজ,
হরেক রকম কষ্ট নেওয়ার ইচ্ছে আজ,
তোমায় বিতং পত্র দেওয়ার চেষ্টা আজ, যখন-
তুমি কেবলই হয়েছ আমরণ পাখি।
ভালোবাসা নিও আমার কবি,
শোক প্রকাশ বড্ড বেশী সেকেলে
নিগুঢ়তত্ত্ব
কোন এক অবসরের মূহুর্তে
আচমকা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে
পাঁজর ভেঙে, অতি নিঃশব্দে।
চরম ব্যস্ততা আর অখন্ড অবসর
প্রায়ই এক বিন্দুতে মিলে যায়, সমার্থক হয়ে যায়।
তখন বুকের বাঁ পাশে অবিরাম শব্দ হয়
যে জায়গাটায়- যেখানে অবিনশ্বরের সদা বসতি ,
ওখান থেকে বানী আসে।
জীবন তো ফুরিয়ে যাবার কিছু নয়,
তবু জীবন শুরু করাটাই খুব জরুরী।
কিংবা হয়তো ভাবতে হবে,
চলন্ত ট্রেনেই বসে থেকে অহেতুক ভাবনায় স্থাণু হয়ে গেছি।
ভাবনাগুলো জোনাকি পোকার মত,
পথ হারিয়ে প্রায়ই বিল্ডিংয়ে ঢুকে যায়।
এভাবে অনেকেই এখন আলোতে আলো বিলাতে ব্যস্ত,
আর এক দল কিন্তু ভাঙা হারিকেনের সলতে উসকাতে
নোনা জলে ভিজে একাকার।
এবার না হয় একটা টিমটিমে কুপি জ্বালানো বড় প্রয়োজন।