পাওনা টাকা আদায়ের উপায়

পাওনা টাকা আদায় করা সত্যি একটি বড় সমস্যা। যখন কেউ টাকা নিতে চায়, তখন খুব সহজেই বিভিন্ন কথা বলে মানুষ টাকা ধার নেয়। টাকা ধার নেওয়ার পরে টাকা পরিশোধ করতে কেউ যদি না চায় তবে তার কাছে থেকে টাকা আদায় করা সত্যি খুবই কষ্টকর ব্যপার। তবে সমস্যা নেই, এধরনের সমস্যা সমাধান করার জন্য আপনি দুই […]

পাওনা টাকা আদায় করা সত্যি একটি বড় সমস্যা। যখন কেউ টাকা নিতে চায়, তখন খুব সহজেই বিভিন্ন কথা বলে মানুষ টাকা ধার নেয়। টাকা ধার নেওয়ার পরে টাকা পরিশোধ করতে কেউ যদি না চায় তবে তার কাছে থেকে টাকা আদায় করা সত্যি খুবই কষ্টকর ব্যপার। তবে সমস্যা নেই, এধরনের সমস্যা সমাধান করার জন্য আপনি দুই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। একটি হচ্ছে স্থানীয় পদ্ধতি এবং আরেকটি হচ্ছে আইনী পদ্ধতি। যদি আপনি স্থানীয় পদ্ধতি ব্যবহার করতে চান তাহলে আপনি যে টাকা ধার দিয়েছেন অথবা আপনি আপনার ব্যবসায়ীক মাল বাকিতে বিক্রি করেছেন তার প্রমানপত্র নিয়ে স্থানীয়ভাবে একটি সালিশীর ব্যবস্থা করতে পারেন। স্থানীয়ভাবে সালিশী করার জন্য আপনি যদি ব্যবসায়ী হন তাহলে বাজার কমিটি, বনিক সমিতির কাছে আপনি নালিস করতে পারেন। সেই সাথে আপনি আপনার ডকুমেন্ট নিয়ে স্থানীয় নির্বাচিত চেয়ারম্যান, মেম্বার, ওয়ার্ড কমিশনারের কাছে আপনি বিচার দিতে পারেন। স্থানীয়ভাবে যদি আপনি বিচার সম্পন্ন করতে পারেন এতে আপনার জন্য উত্তম।

আর যদি আপনি স্থানীয়ভাবে এ সমস্যার সমাধান করতে না পারেন তাহলে আপনাকে আইনীভাবে এ সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে। আইনীভাবে সমস্যার মোকাবেলা করার জন্য আপনাকে প্রথমেই যেতে হবে একজন আইনজীবীর কাছে। একজন আইনজীবী আপনার পক্ষে পাওনাদারকে একটি লিগ্যাল নোটিশ দিবেন। নোটিশে তিনি উল্লেখ করবেন আপনি যে পরিমানে টাকা পান সেই টাকা ৩০ দিনের মধ্যে যেন পাওনাদার ফেরত দেয় এবং এই লিগ্যাল নোটিশটি পাওনাদারকে পাঠানো হবে তার বসবাসের ঠিকানায়। সরকারি ডাকযোগে প্রাপ্তি স্বীকারপত্রসহ পাঠানো হবে। এই লিগ্যাল নোটিশ পাওয়ার পরে যদি পাওনাদার টাকা পরিশোধ না করেন, তাহলে ৩০ দিন পরে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের আইনী প্রক্রিয়া গ্রহন করা যেতে পারে। 

আইনী প্রক্রিয়ায় ১ম ধাপে যে কাজটি করতে পারেন সেটি হচ্ছে আপনি আপনার পাওনা টাকার সাপেক্ষে যে প্রমাণাদি আছে, প্রমাণাদি হতে পারে আপনার ব্যবসায়িক হিসাব, প্রমানাদি হতে পারে টাকা প্রদানের রশিদ, প্রমানাদি হতে পারে চুক্তিপত্র ও অঙ্গীকারনামা। এসমস্ত কাগজপত্র নিয়ে আপনি আপনার স্থানীয় থানায় গিয়ে টাকা আত্মসাতের একটি মামলা করতে পারেন।

স্থানীয় থানা বলতে কি বোঝায়? স্থানীয় থানা বলতে বোঝায় আপনি যে থানায় বসবাস করেন সে থানা হচ্ছে আপনার স্থানীয় থানা। আপনি আপনার স্থানীয় থানায় মামলা করতে পারেন অথবা আপনি যার কাছে টাকা পান সে যে থানায় বসবাস করেন সেই থানায় গিয়েও আপনি একটি মামলা করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে থানায় মামলা করা সম্ভব হয়না। যদি আপনি থানায় মামলা না করতে পারেন সেক্ষেত্রে আপনি হতাশ হবেন না। হতাশ না হয়ে আপনি যে কাজটি করবেন সেটা হলো আপনার স্থানীয় যে কোর্ট, সেই কোর্টে অর্থাৎ ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে গিয়ে আপনি একটি মামলা করতে পারেন। 

স্থানীয় কোর্ট বলতে আপনি যে থানায় বসবাস করেন সেই থানার জন্য নির্ধারিত একটি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট আছে। আপনি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে গিয়ে আপনার টাকা আদায়ের জন্য দন্ডবিধি ৪০৬ এবং ৪২০ ধারায় আপনি একটি (নালিশী মামলা), সি আর মামলা করতে পারেন। নালিশী মামলায় আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি আপনার কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। আপনি তাকে সরল বিশ্বাসে টাকা দিয়েছেন। তিনি টাকা ফেরত না দিয়ে ৪০৬ ধারার অপরাধ করেছেন। অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। আপনি যে টাকা দিয়েছেন সরল বিশ্বাসে কিন্তু আপনার টাকা ফেরত না দিয়ে আপনার সরল বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। সেই সাথে আপনি যে টাকা দিয়েছেন সেই টাকা ফেরত দেওয়ার নাম করে আজ টাকা দিবে কাল টাকা দিবে এধরনের বিভিন্ন রকমের ছলচাতুরি করে, ৪২০ ধারা মোতাবেক তিনি আপনার সাথে প্রতারণা করেছেন। 

এই দুই ধারায় মামলা করলে আপনি যখন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গিয়ে স্ব-শরীরে হাজির হবেন, বিজ্ঞ-আদালত আপনার স্বাক্ষ গ্রহণ করে যদি মনে করেন মামলাটি গ্রহণ করা প্রয়োজন তাহলে বিজ্ঞ-আদালত মামলাটি গ্রহণ করবেন। যদি তিনি মামলাটি গ্রহণ করেন তাহলে বিজ্ঞ-আদালত আসামীকে একটি সমন দিবেন অথবা গ্রেফতারী পরয়ানা (ওয়ারেন্ট) দিবেন। (গ্রেফতারী পরয়ানাকে ইংরেজিতে ওয়ারেন্ট বলে)।

আপনাকে মনে রাখতে হবে, যদি ফৌজদারী কার্যবিধী অনুসারে ফৌজদারী মামলা করেন তাহলে টাকা আদায় করার জন্য আদালত কোনো রায় প্রদান করবেন না। আদালত রায় প্রদান করে দন্ড দেন, জরিমানা প্রদানের আদেশ দেন। সাধারণত জেল, জরিমানার ভয়ে আসামী এই পর্যায়ে পাওনা টাকা পরিশোধ করে দেন। 

যদি আপনি পাওনা টাকা ফেরত পেতে চান তাহলে আপনাকে দেওয়ানী আদালতে গিয়ে একটি মানিমোকদ্দমা করতে হবে। মানিমোকদ্দমা করার জন্য আপনার নির্ধারিত দেওয়ানী আদালতে গিয়ে নির্দিষ্ট কোর্ট ফি দাখিলপূর্বক মানিমোকদ্দমা করতে হবে। 

নির্দিষ্ট কোর্ট ফি কে এডভালোরেম কোর্ট ফি বলে। আপনার পাওনা টাকার জন্য ২.৫ শতাংশ হারে এডভালোরেম কোর্ট ফি প্রদান করে মানিমোকদ্দমা করতে হবে সেই সাথে এই টাকার ১৫% ভ্যাট প্রদান করতে হবে।  দেওয়ানী কার্যবিধি ১৯০৮ এর ধারা ৭ বিধি ২ অনুসারে মানিমোকদ্দমা করার সময় আপনি যে টাকা পান সেই টাকার কথা সুনির্দিষ্টভাবে মোকদ্দমার আরজিতে উল্লেখ করতেই হবে। আরজিতে আপনি যে টাকা ধার দিয়েছেন বা যে টাকা আপনি পান সেই টাকার যে সুদ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল সেটি ক্যালকুলেশন করে আপনি আরজিতে উল্লেখ করতে পারেন। সেই সাথে আপনার টাকা আদায় করার জন্য মোকদ্দমা করার জন্য যে পরিমান টাকা খরচ হবে সেই টাকা আপনি আদালতের কাছে ফেরত পাওয়ার জন্য আর্জিতে প্রার্থনা করতে পারেন। 

বিজ্ঞ আদালত যদি সন্তুষ্ট হন সেক্ষেত্রে শুনানি শেষে স্বাক্ষী-প্রমাণ শেষে আপনার পক্ষে আদেশ, রায়, ডিগ্রী প্রদান করবেন। ডিগ্রী প্রদান করলে ডিগ্রী কার্যকরের মাধ্যমে আপনি টাকা ফেরত পেতে পারেন। 

এছাড়া যদি কোনো ব্যক্তি কোথাও চাকুরী করেন সেক্ষেত্রে যিনি চাকুরী করেন তিনি যদি তার নিয়োগকর্তার কাছে কোনো টাকা-পয়সা পায়, তাহলে তিনি নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে লেবার কোর্টে মামলা দায়ের করে টাকা আদায় করতে পারেন। 

যদি লেবার শ্রেণীভুক্ত না হন, সাধারণ কোনো ব্যক্তি হন, তাহলে তার পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য দেওয়ানী আদালতেই তাকে মোকদ্দমা করে প্রতিকার গ্রহন করতে হবে। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে। তামাদী আইনের তফসিল ১ অনুচ্ছেদ ৫৭ মোতাবেক বলা হয়েছে টাকা আদায়ের জন্য মোকদ্দমা করতে হবে যেদিন টাকা দেওয়া হয়েছে সেই দিন থেকে ৩ বছরের মধ্যে। ৩ বছরের মধ্যে যদি আপনি মোকদ্দমা না করেন তবে এটি তামাদী আইনের এই ধারা মোতাবেক বিরত হয়ে যাবে। সেজন্য আপনি দেরি না করে অল্প সময়ের ভিতরে আপনার পাওনা টাকা আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। আপনি স্থানীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন অথবা আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারেন। টাকা লেনদেনের সময় অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর, টাকার রশিদ/প্রাপ্তি স্বীকারপত্র, স্বাক্ষী, অথবা অন্যান্য কোনো প্রমানপত্র রাখা উচিত।
মার্টিন ফলিয়া: এ্যাডভোকেট ও সাংবাদিক