দ্রুত ফিরে পাক ইছামতী তার প্রাণ

বাংলার নদীমাতৃক ভূখণ্ডে নদী মানেই জীবন, সভ্যতা ও অর্থনীতির স্পন্দন। সেই জীবনধারারই এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঢাকার দোহার নবাবগঞ্জের  ইছামতী নদী আজ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। এক সময়ের স্রোতস্বিনী, প্রাণবন্ত এই নদী এখন দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার নির্মম শিকার। প্রশ্ন হচ্ছে—নদী কি নিজের দোষে মরে যাচ্ছে, নাকি আমরা তাকে পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি? দেশের বহু জেলা জুড়ে […]

বাংলার নদীমাতৃক ভূখণ্ডে নদী মানেই জীবন, সভ্যতা ও অর্থনীতির স্পন্দন। সেই জীবনধারারই এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঢাকার দোহার নবাবগঞ্জের  ইছামতী নদী আজ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। এক সময়ের স্রোতস্বিনী, প্রাণবন্ত এই নদী এখন দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার নির্মম শিকার। প্রশ্ন হচ্ছে—নদী কি নিজের দোষে মরে যাচ্ছে, নাকি আমরা তাকে পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি?

দেশের বহু জেলা জুড়ে বিস্তৃত ইছামতীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জ এলাকায়। পদ্মার মুখে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ফলে এ অঞ্চলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় থেমে গেছে। নদীর স্রোত বন্ধ মানেই তার প্রাণশক্তি ক্ষয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীর তীর দখল এবং শিল্প ও বাজারের বর্জ্য সরাসরি নদীতে নিক্ষেপ। ফলে একসময়কার স্বচ্ছ পানির নদী এখন কালো, দুর্গন্ধযুক্ত ও মাছশূন্য জলাধারে পরিণত হয়েছে।

কৈলাইল, শিকারীপাড়া, বারুয়াখালী, নয়নশ্রী আগলা, বাহ্রা, কলাকোপা ও বান্দুরা ইউনিয়ন—এসব এলাকায় ইছামতীর চিত্র আজ একই রকম বেদনাদায়ক। স্থানীয় কৃষকেরা একসময় এই নদীর পানিতে সেচ দিয়ে ফসল ফলাতেন। জেলেরা মাছ ধরে সংসার চালাতেন। নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ছিল নিয়মিত। আজ সেই নৌপথ বন্ধ, কৃষি হুমকির মুখে, জীবিকা বিপর্যস্ত।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—দেশের সর্বোচ্চ আদালত নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবে সেই অধিকার রক্ষায় কার্যকর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। কাগজে-কলমে স্বীকৃতি থাকলেও দখল ও দূষণ অব্যাহত রয়েছে। রাজধানী ঢাকার শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য পাশ্ববর্তী নদীপথ হয়ে ইছামতীতে এসে মিশছে, যা দূষণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তবে আশার আলোও রয়েছে। ইছামতী রক্ষায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছে নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটি,  সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড 

থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম এবং ইছামতী বাঁচাও আন্দোলনসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। তারা ধারাবাহিকভাবে মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান, জনসচেতনতা কার্যক্রম ও প্রশাসনের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।

সংগঠনগুলোর অন্যতম দাবি—নদীর উৎপত্তিস্থল কাশিয়াখালী-সোনাবাজু বেরিবাঁধ এলাকায় একটি কার্যকর স্লুইচগেট স্থাপন। তাদের মতে, পরিকল্পিতভাবে সুইচগেট নির্মাণ করা হলে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে এবং বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন ও শুষ্ক মৌসুমে পানিধারণ নিশ্চিত হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড আমাদেরকে জানিয়েছে, স্লুইচগেট স্থাপনের কাজ অনেক দূর এগিয়েছে এবং সোনাবাজু বেরিবাঁধে সুইচগেট নির্মাণ হবেই। কর্মকর্তারা দফায় দফায় নদী পরিদর্শন করছেন—এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে আমরা সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ মনে করি, আশ্বাস নয়—এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান ও দ্রুত কার্যক্রম শুরু। সময়ক্ষেপণ মানেই নদীর ক্ষয় আরও ত্বরান্বিত হওয়া।

উল্লেখ্য, এটি স্থানীয় সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক–এর একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও। তিনি আন্তরিকভাবেই ইছামতী নদীর দুর্দশা কাটিয়ে আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমাদের প্রত্যাশা—তিনি আরও সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবেন।

ইছামতীর মৃত্যু শুধু একটি নদীর বিলুপ্তি নয়; এটি আমাদের পরিবেশগত অবহেলা, প্রশাসনিক শৈথিল্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ঘাটতির প্রতিচ্ছবি। একটি নদী বাঁচলে বাঁচে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রা। নদী মরে গেলে হারায় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ।

এখনও সময় আছে। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা এবং দ্রুত সুইচগেট নির্মাণের বাস্তবায়ন। উন্নয়নের নামে নদী হত্যা নয়—টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নদীর পুনর্জাগরণই হোক অঙ্গীকার।

সময় এখনই—দ্রুত ফিরে পাক ইছামতী তার প্রাণ।

মো. রাশিম মোল্লা : সিনিয়র রিপোর্টার, মানবজমিন এবং সাধারণ সম্পাদক, নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটি।