যদি আমি একটি ভিডিও কন্টেন্ট বানাই এবং গ্রামের কিশোরী শব্দটি উচ্চারণ করি তাহলে আপনি কি ভিউজুয়াল করবেন ২০২৬ সালে?
প্রায় সবাই স্কুলে যাচ্ছে। অনেকের হাতেই এনড্রয়েড মোবাইল। অনেক স্বপ্ন চোখে, প্রশ্ন করলে উত্তর দিবে ডাক্তার হবো। অথচ একবারও খেয়াল করেনি তার গ্রামের একটি মেয়েও কোন পেশাগত জীবনে যায়নি, যারা তার মতোই এক সময় স্কুলে গিয়েছিল।
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আমরা গর্বের সাথে বলি, সাফল্যে আছি বাংলাদেশ। আসলে কারা আছে? মিডিয়া কাদের শোকেস করছে- সফলদের, সেটার পার্সেন্টেজ কত? এই গ্যাপ এনালাইসিস আর প্রশ্ন দিয়ে শুরু হোক আমাদের আলোচনা।
গ্রামের একটা মেয়ে ক্লাস সিক্সে পড়া মাত্র শুরু হয় সামাজিক চাপ। মেয়ে হবার কারণে ইতোমধ্যে তারা পারিবারিক মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়েছে। তাকে খেলতে দেয়া হয়েছে পুতুল দিয়ে, রান্না করবে মেয়ে; ছেলে হেঁশেলে যাবেও না। রূপচর্চা করবে- তাকে সুন্দর হতেই হবে। মোবাইলে গেইম খেলবে পুতুলের মেকাপ, কন্টেন্ট দেখবে রান্না শেখার, নানা ধরনের টিউটোরিয়াল মেকাপের, টিকটকার হবে অবশ্যই, মন মতো জামা অনলাইনে অর্ডার করে না নিতে পারলে সে সুইসাইডও করতে পারে।
অফলাইনে গ্রামের মেলা থেকে কিনে দেয়া হয় হাড়ি-পাতিল। রান্না কর মা, এভাবেই রান্না শেখো হাজার রকম যেন স্বামীর বাড়ির সবার মন জয় করতে পারো। অর্থাৎ খাওয়া ছাড়া জীবনে প্রডাক্টিভ কিছু নাই এবং ভাল রান্না না জানলে ভাল বউ হওয়া যায় না। যুক্তিযুক্তভাবে রান্না অবশ্যই শিল্প ও প্রয়োজনীয় কিন্তু এটাই একটা মানুষের জীবনের পরম লক্ষ্য হতে পারে না, যদি না শেফ হওয়া তার স্বপ্ন হয়।
এমন কিছু সীমাবদ্ধ বিশ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠা কন্যা শিশুটির ক্লাস সিক্সে বিয়ের প্রস্তাব আসে।
এই প্রস্তাব বিয়ে পর্যন্ত না গড়ালেও বিশাল প্রভাব ফেলে কিশোরীর জীবনে।
প্রথমত, ভয় কাজ করে তার জীবনের স্বপ্ন পূরণ না হবার। দ্বিতীয়ত, দেশ একজন প্রডাক্টিভ মানুষ হারায়
তৃতীয়ত, কিশোরী অল্প বয়সে মা হওয়াসহ যেসব পারিবারিক ঘটনার মধ্য দিয়ে যায় তা অমানবিক এবং এসডিজি অর্জনের অন্তরায়।
বিয়ের সানাই কানে বাজলে সুস্থ কোন কিশোরীর পক্ষে পড়ালেখা ও ক্যারিয়ারে মনোযোগী হওয়া কঠিন।
সেক্স এডুকেশন না থাকার কারণে অনেক কিশোরীই প্রেম ও শারিরীক সম্পর্কে ফোকাস হয়ে নিজেকে হারায়। প্রেমিককে পাওয়াই তার জীবনের পরম পাওয়া মনে হয়। প্রেমাসক্তি তাকে ঘর থেকে পালাতে বাধ্য করে। ফলে ক্লাস নাইন থেকে তারা যে কন্টেন্ট দেখে তা বিশাল এক প্রভাব ফেলে মনে কারণ তারা যা দেখে তাই শেখে।
আশেপাশের গ্রামে প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে করা প্রেমিককে না পেয়ে সুইসাইড করা এসব কিশোরীরদের ডাটা এনালাইসিস করলে দেখবেন এদের সমস্যা কি? এদের সমস্যা মানসিক।
আমাদের দেশে এড়িয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, যেটা প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজন।
আপনার গ্রামের কয়জন কিশোরী পরিণত নারী হতে পেরেছে স্বাবলম্বী হয়ে? প্রতিবছর একটা স্কুলের এক ব্যাচের ৫/১০ জন এর বেশি কখনো প্রডাক্টিভ জনবলে পরিণত হয় না।
গ্রাম থেকে যারা সফল তাদের কেস স্টাডি দেখুন। পড়াশোনা করে ভাল, সৃজনশীল চর্চা করে, স্কাউটিং করে।
তারা সবকিছুতে ভাল তাদের দেখা যায় নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে।
অভিভাবক হিসেবে আপনার ভুল কোথায়? প্রথমত বাবা-মা ছাড়া পরিবারে অন্য কেউ কখনো চাইবে না কিশোরী তার নিজস্ব পরিচয় গড়ুক। বাবা-মাকে পরিবার ও সমাজের সাথে যুদ্ধ করে কিশোরীকে পড়াতে হবে, লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে হবে।
আপনি অভিভাবক হিসেবে সন্তানকে বই পড়তে দিয়েছেন কি? ছবি আকলে পাপ, নাচ-গান করলে পড়া হবে না- এ জাতীয় নানা কুসংস্কারে নিজ হাতে গোটা প্রজন্মকে মেধার বিকাশ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। প্রাচীন কাল থেকে পুরুষতন্ত্রের যে কালো থাবা তা শিক্ষিত পরিবারেও থাকে অদৃশ্য ভূত হয়ে।
আমার নিজ গবেষণা থেকে জানা- গ্রামের মেয়েরা সংবাদপত্র চেনে না।
তাদের বলা হয় গণিতে দূর্বল। কখনো তারা বর্ণজট, সুডোকো এসব গেইম খেলে নি। দেশে নানা রকম অলিম্পিয়াড হয় সেখানে তাদের অংশগ্রহন নাই।
যেখানে আমাদের দেশের বিস্ময়শিশু আরিয়েত্তি রোবট তৈরি করছে, সেখানে গ্রামে আরিয়েত্তির বয়সের একটা মেয়ে আরিয়েত্তিকে চিনে না, কেয়া পায়েলকে চিনে কারণ সিরিয়ালের ভাল বউ। সেই আগের জায়গাতেই কিন্তু আটকে আছি আমরা। এসব গ্যাপ মিডিয়ার তৈরি কারণ জিপিএ ফাইভ পাওয়াদের মোটিভেশন দেয় নাটক সিনেমার মানুষ গ্ল্যামার দিয়ে।
পৃথিবীটা যে গ্ল্যামারের উর্ধ্বে তা নারীদের বুঝতে সুযোগ দিচ্ছে না আধুনিক মিডিয়া নির্ভর পুজিবাদ। ফলে একজন সুশিক্ষিত মেয়েও তার চামড়া ভাজ খেলে সব শেষ এই মানসিকতায় থাকে। অল্প কারণেই সুইসাইড করে নেয়। নারীর এই মানসিক সমস্যা গ্রাম ছাপিয়ে শহুরে কাজের ডেস্কেও চলে যায় চাইল্ডহুড ট্রমা আর সমাজ তাকে কি বিশ্বাসে বড় করেছে তাতে।
প্রযুক্তি নির্ভর জীবনে প্রযুক্তি ব্যবহারে ভয় নারীর। সোশ্যালমিডিয়ায় নিজের পরিচয়ে নিজে থাকার মতো সাহস রাখে না। প্রফাইলে ফুল পাখি লতা পাতা। আমাদের মিডিয়ার তৈরি ফুল মানে নারী! কতটা পিছিয়ে আমরা। সময়টা ২০২৬- উত্তরণ কোন পথে?
একটা পরিবর্তনের উদাহরণ দিই। আমাদের পারিবারিক সাংস্কৃতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নবাবগঞ্জের প্রথম পূর্ণাঙ্গ একাডেমি নবাবগঞ্জ ললিতকলা একাডেমি (নাফা) লিডারশীপ দক্ষতায় সৃজনশীল ও মানবিকতার বিকাশে সেবা দিয়ে আসছে ১৯৯৯ সাল থেকে।
২০২০ সাল থেকে গ্রামের মেয়েদের জন্য আমি গড়ে তুলি নারীর ক্ষমতায়নে মোটিভেশনাল কার্যক্রম প্রতিষ্ঠাতা, ইনভিশন অ্যাকশন রিওয়ার্ড অ্যাসেট (ইয়ারা)। যেখানে বিনামূল্যে প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েদের বয়সভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা. ক্যারিয়ার গাইডলাইন , উদ্যোক্তা তৈরি সহ নানা রকম কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। আর এ কাজটি আমি করেছি আমার পেশাগত জীবনের পাশাপাশি নিজস্ব ফান্ডে। সাহস আর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ছিল না।
গ্রামের কিশোরীদের দেশের নেতৃত্ব দিতে দেখতে চাই। অর্থনৈতিক মুক্তি একজন নারীকে পূর্ণতা দেয় কিন্তু সমাজ শেখায় তোমার আর লাগবে না। তোমার পিতা কিংবা স্বামীর টাকাই যথেষ্ট । কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখেন প্রতিটি নারীর মনে হাহাকার আছে । নিজেকে না গড়তে পারার।
২০০৬ সালে যে মেয়েটির ক্লাস সিক্সে পারিবারিক চাপে বিয়ে হয়েছিল তার কন্যা এখন পালিয়ে যেয়ে বিয়ে করে নিয়েছে। মায়ের স্বপ্ন ছিল যেহেতু আমি পারি নাই আমার সন্তান কিছু হবে। এমনই গ্রামীন মানসিকতার দুষ্টুচক্রে আবর্তন দেশের বেশি সংখ্যক নারীর। যে স্বপ্ন মায়ের সে আশা গুড়ে বালি। নারীর আশাকে দিশায় এবং বাস্তবে পরিণত করতে হবে। তা ব্যতীত এ দেশে অর্থনৈতিক মুক্তি অসম্ভব।
পাঠকের প্রশ্ন: লেখক, আপনি কি বলতে চান নারীরা গৃহিনী হলে তার জীবন বৃথা?
লেখক: নারী যেহেতু মা, জাতির রূপকার, তাই গৃহিনী হলেও তাকে হতে হবে স্মার্ট। লিঙ্গ বৈষম্য বিবর্জিত। সন্তানকে তিনি দেখবেন মানুষ হিসেবে, গড়বেন আগামীতে দেশের নেতৃত্ব দিতে।
সায়মা রহমান তুলি: প্রতিষ্ঠাতা, ইনভিশন অ্যাকশন রিওয়ার্ড অ্যাসেট (ইয়ারা)