আমরা সবাই ভালো থাকতে চাই। কিন্তু “ভালো থাকা” বিষয়টি নিয়ে নানান জনের নানান ধারণা আছে। দেখা যায়-কারও আর্থিক অনটন নেই, জাগতিক জীবনে তিনি সফল , তবু জীবনযাপনে তিনি অসুখী; আবার কারও জীবন সংগ্রামে-সংকটে ভরা, তবু তিনি ভেতরে এক ধরনের শান্তি বা ভালো থাকা অনুভব করেন।এটিই আমাদের ইতিবাচক জীবনযাপনের জন্য আলাদা কিছু ভাবতে শেখায়। ইতিবাচক জীবনযাপন […]
আমরা সবাই ভালো থাকতে চাই। কিন্তু “ভালো থাকা” বিষয়টি নিয়ে নানান জনের নানান ধারণা আছে। দেখা যায়-কারও আর্থিক অনটন নেই, জাগতিক জীবনে তিনি সফল , তবু জীবনযাপনে তিনি অসুখী; আবার কারও জীবন সংগ্রামে-সংকটে ভরা, তবু তিনি ভেতরে এক ধরনের শান্তি বা ভালো থাকা অনুভব করেন।এটিই আমাদের ইতিবাচক জীবনযাপনের জন্য আলাদা কিছু ভাবতে শেখায়। ইতিবাচক জীবনযাপন আসলে কী? ইতিবাচক জীবনযাপন মানে কষ্ট অস্বীকার করা নয়; বরং কষ্টকে স্বীকার করেও জীবনকে অর্থপূর্ণভাবে যাপন করার সক্ষমতা অর্জন করা। জীবনের বাস্তবতাকে সামলে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি মানসিক দক্ষতাই হচ্ছে ইতিবাচক জীবনযাপন।
ইতিবাচকতা: আবেগ অস্বীকার নয়, আবেগ বোঝা
“ইতিবাচক থাকুন” কথাটি প্রায়ই এমনভাবে বলা হয়, যেন দুঃখ, রাগ বা হতাশা কোনো ব্যর্থতার লক্ষণ। অথচ বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। মানুষের সব আবেগই স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন আমরা নেতিবাচক আবেগকে দুর্বলতা ভেবে অবদমন করে রাখি।
আবেগকে দমন না করে বোঝা—এটাই মানসিক পরিপক্বতার প্রথম ধাপ। ছোটবেলায় ছেলে শিশুদের কান্না থামাতে অনেকে বলেন ‘এই তুমি কী মেয়ে নাকি, মেয়েদের মত কাঁদছো কেন’ বা কোনো মেয়ে একটু জোরে হাসলে অনেককে বলতে শোনা যায় ‘মেয়েদের এত জোরে হাসতে হয়না’ । এভাবে আমরা অন্যের আবেগীয় প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব তৈরি করি, হাসি-কান্নাকে চাপিয়ে রাখতে শেখাই- যেটা তার চিন্তা ও ধারণার বিকাশ বা কগনিটিভ ডেভেলপমেন্টকে প্রভাবিত করে। এই আবেগ অবদমন করতে করতে তার জীবনযাপন প্রণালী হয়ে উঠে সামাজিক দক্ষতাবিহীণ আর ত্রটিপূর্ণ যোগাযোগে ভরা। নিজের আবেগকে সে বোঝেনা, অপরের আবেগের মূল্যও তার কাছে নেই। তাই একদিকে নিজের জীবনযাপন হয়ে উঠে একঘেঁয়ে বিরক্তিকর, কিছু পার্থিব লক্ষ্যে ঠাসা আর অপরের সাথে তার যোগাযোগ দক্ষতা তলানীতে পড়ে থাকে। ফলে ইতিবাচক জীবন যাপন তার হয় না- মানসিক বিপর্যস্ততা , সীমাহীন আকাঙ্ক্ষায় পূর্ণ মন নিয়ে অতৃপ্ত জীবন যাপন করে সে।
চিন্তার ধরণই জীবনের অভিজ্ঞতা তৈরি করে: নিজের চিন্তাকে প্রশ্ন করতে শিখুন
মানুষের বিকাশের একটি বড় অংশই হচ্ছে কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট বা চিন্তা ও আবেগের বিকাশ।
এর অর্থ হচ্ছে- কোনো বস্তু, বিষয় বা ঘটনা আমাদের আনন্দ বা কষ্ট দেয় না, বরং বস্তু, বিষয় বা ঘটনা সম্পর্কে আমাদের ব্যাখ্যা, চিন্তা ও ধারণাই আমাদের আনন্দ ও কষ্ট দেয়। কেউ পরিযায়ী পাখির জন্য জলাশয় তৈরি করে আনন্দ পায়, কেউ পরিযায়ী পাখিকে ফাঁদ পেতে ধরে বাজারে মাংশের জন্য বিক্রি করে আনন্দ পায়। পরিযায়ী পাখির প্রতি প্রত্যেকের ব্যাখ্যা, চিন্তা ও ধারণাই তাদের বিপরীতমুখী কাজের প্রতি আগ্রহাণ্বিত করে, আনন্দের উৎস তৈরি করে। কিন্তু এর ভেতরে কোন ধরণের কাজটি ইতিবাচক ? যিনি ফাঁদ পেতে পাখি ধরে আনন্দিত হচ্ছেন, তিনি কেবল নিজের জন্য আনন্দ তৈরি করছেন, পৃথিবীটাকে কেবল নিজের মনে করেন, অপরের আবেগের প্রতি তার মূল্য নেই, মানুষের বাইরেও অন্য প্রাণীরাও যে পৃথিবীর অংশ সেটা বুঝতে তিনি অপারগ, এটাই তার কগনিটিভ ডেভেলপমেন্টের ত্রুটি।
এই কগনিটিভ বিকাশের কারণে দুজনের চিন্তার কাঠামো আলাদা। একজন ভাবেন, “জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক, পৃথিবীটা সকলের , সকলেই ভাগ করে নেব ”; আরেকজন ভাবেন, “আমি অর্জন করতে পেরেছি- আমি পাখিটাকে আটকাতে পেরেছি, আমার খাদ্য আমি সংগ্রহ করেছি।” এই ‘আমিময়’ কাজ আর চিন্তা আমাদের সামাজিক দক্ষতা কমিয়ে দেয় – নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় চারপাশটা তার কাছে অনেক ছোট হয়ে আসে। ।
নিজের চিন্তাকে প্রশ্ন করা -“এই চিন্তাটি কি একমাত্র সত্য?”- ইতিবাচক জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক কৌশল। নিজের ভাবনাকে চ্যালেন্জ করতে হবে, বিকল্প ভাবনার দুয়ারগুলো খুলতে হবে। কেবল নিজের জন্য নয়- অপরের জন্য ভাবতে হবে।
নিজের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করুন: নিজেকে ধন্যবাদ দিন, নিজেকে ভালোবাসুন
আমরা প্রায়ই অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভাবি, কিন্তু নিজের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন—তা নিয়ে খুব কমই চিন্তা করি। অথচ একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ভিত্তি গড়ে ওঠে তার নিজের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর।
নিজের ভুলে নিজেকে অপমান করা, নিজকে দোষী ভাবা, নিজের অর্জনকে তুচ্ছ করা, ব্যর্থ ভাবা, নিজের অনুভূতিকে অবহেলা করা—এসব আমাদের ভেতরের শক্তিকে ক্ষয় করে। আত্ম-সহমর্মিতা (self-compassion) মানে নিজেকে ছাড় দেওয়া নয়; বরং নিজের সঙ্গে ন্যায্য ও মানবিক আচরণ করা। যে মানুষ নিজেকে বুঝতে শেখেন, তিনি ধীরে ধীরে জীবনকেও বুঝতে শেখেন। প্রতিদিন নিজেকে অন্ত:ত একবার করে ধন্যবাদি নিন। এতে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস বাড়বে। আর নিজের আত্মবিশ্বাস অপরের সাথে আপনার সম্পর্ক তৈরি করতে সাহায্য করবে। চারপাশের মানুষ, গাছপালা প্রকৃতি এমন কি ইটপাথরের শহরের সাথে যদি আপনার সম্পর্ক তৈরি না হয় তবে পরিপূর্ণ ইতিবাচক জীবন যাপন সম্ভব হবেনা, অনেকের মাঝে থেকেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন একাকী মানুষে পরিণত হতে পারেন আপনি। তাই সবার আগে নিজেকে ভালোবাসুন। নিজের সাথে নিজের সম্পর্ক তৈরি করুন।
নতুন বন্ধু তৈরি করুন: পুরাতন বন্ধুত্ব ঝালাই করুন
মানুষ সামাজিক প্রাণী। অপরের সাথে সম্পর্ক ইতিবাচক জীবন যাপনের অন্যতম প্রধান উপাদান। কিন্তু সব সম্পর্কই যে ভালো, তা নয়। কিছু সম্পর্ক আমাদের শক্তি জোগায়, আবার কিছু সম্পর্ক নিঃশব্দে আমাদের ভেঙে দেয়।
ইতিবাচক জীবনযাপনের জন্য দরকার—
· নিরাপদ ও সম্মানজনক সম্পর্ক
· প্রয়োজনে ‘না’ বলতে পারা
· মানসিকভাবে ক্ষতিকর সম্পর্ক থেকে দূরে থাকা
একটি সহানুভূতিশীল বা এমপ্যাথেটিক সম্পর্ক মনের ক্ষতকে সারিয়ে তুলতে পারে। কেবল মানুষ নয়, প্রকৃতির সাথেও সম্পর্ক তৈরি করুন।
কৃতজ্ঞতার চর্চা করুন : নিজের পরিতৃপ্তির সীমা নির্ধারন করুন
কৃতজ্ঞতা একটি শক্তিশালী মানসিক অনুশীলন, যা আমাদের ইতিবাচক জীবন যাপন করতে সাহায্য করে। । নিয়মিত কৃতজ্ঞতা চর্চা করলে আমাদের ব্রেইন ধীরে ধীরে -অভাব নয়, প্রাপ্তির দিকে মনোযোগ দিতে শেখে । তৃপ্তিবোধ বাড়ে, নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস বাড়ে ।
কৃতজ্ঞতা মানে এই নয় যে জীবনে কষ্ট নেই। বরং কষ্টের মধ্যেও ভালো দিকগুলোকে খুজেঁ বের করা। প্রতিদিন কয়েক মিনিট নিজেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন —আজ কী কী ভালো ঘটেছে, আর এই ভালোর জন্য যে বা যারা ভুমিকা রেখেছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হোন; হতে পারে সেই ব্যক্তিটি আপনার খুব কাছের আবার একেবারেই অজানা, কিংবা আপনি নিজেই সেই ব্যক্তি। তাই অপরের প্রতি বা নিজের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
খারাপ সময়কে ভালো কাজে লাগান
সময় একই রকম যায়না, যাপিত জীবনের সবটাই স্বপ্নে ভরা নয়। আসে সংকট, আছে অপ্রাপ্তি। অথবা অপরের আচরণ আপনাকে বেদনাহত করতে পারে। এই সময়টা কেবল আক্ষেপ না করে, প্রতিহিংসার পরিকল্পনা না করে কোনো একটি ভালো কাজে ব্যয় করুন। সবচাইতে ভালো নিজের সফট স্কিল বাড়াতে থাকুন। যেমন আপনার জীবনে একটি খারাপ সময় এসেছে- পরিচিত মানুষেরাও অপরিচিতের মত হয়ে গেছে, অনেকে হয়তো আপনার সাথে যোগাযোগ রাখতে চাইছে না কিংবা বড় ধরণের সামাজিক সংকটে পড়ে গেছেন। ম্রিয়মাণ হবেন না, আক্ষেপ করবেন না, ইন্টারনেটে ডুমস্ক্রোরিং করে সময় নষ্ট করবেন না, আপনার ভালো সময় এলে কি প্রতিশোধ নেবেন এধরণের চিন্তা করবেন না। নিজেকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করুন, নতুন কিছু শিখুন, কোনো কোর্সে ভর্তি হয়ে যান, সামাজিক সংগঠনে যুক্ত হয়ে মানুষের জন্য কাজ শুরু করুন, তালিকা তৈরি করে ৫০ টি বই পড়ে ফেলুন ।
ছোট ছোট ইতিবাচক অভ্যাস বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে
বড় পরিবর্তনের কথা না ভেবে, রাতারাতি সবকিছু ইতিবাচক হয়ে যাবে এধরনের দিবা স্বপ্নে না ভুগে ছোট ছোট অভ্যাসের চর্চা করুন।
পর্যাপ্ত ঘুম, রাত না জাগা, নিয়মিত হাঁটা, সময়মতো স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করা —এসব বিষয় খুব সাধারণ মনে হলেও, এগুলো সরাসরি মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ধরণের ছোট ছোট অভ্যাস আপনার শরীরকে ভালো রাখবে, মনকে ভালো রাখকে, জীবন যাপনে নেতিবাচক ভাবনা ও আচরণ অনেক কমাবে।
জীবনের অর্থ: আনন্দের চেয়েও গভীর কিছু
‘মানুষ শুধু সুখ চায় না; মানুষ জীবনের অর্থ খোঁজে’। হাজারো কষ্ট আর বিপর্যয়ের মধ্যেও যদি জীবনের কোনো অর্থ থাকে, মানুষ তখন সেই সংকটকাল অতিক্রম করতে পারে।
জীবনের অর্থ বুঝতে হলে যেসব বিষয়ে জোর দিতে হবে-
· পরিবার এর সাথে সম্পর্ক
· সামাজিক সম্পর্কের চর্চা
· নিজের পেশাগত দায়িত্ব- সামাজিক দায়িত্ব
· অপরের জন্য কিছু করা- দেশের জন্য বা পৃথিবীর জন্য কিছু করা
· নিজের ভাবনা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন এবং অপরের ভাবনা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস কে শ্রদ্ধা করা
ইতিবাচক জীবন মানে শুধু ভালো লাগা বা নিজের আনন্দের পেছনে ছোটা নয়; বরং অর্থপূর্ণ জীবনের দিকে এগোনো।
সংকটে একে অপরের পাশে থাকা
সংকটকালে অপরের সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, বরং সচেতনতা। কখনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা, কখনো পেশাদার কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া—এসবই ইতিবাচক জীবন যাপনের অংশ। আপনি অপরকে সাহায্য করতে শিখুন, আর নিজের প্রয়োজনে অকপটে অপরকে আপনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলুন।
ইতিবাচক জীবন যাপনের জন্য খুব বেশি সম্পদের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন আপনার চিন্তার পরিবর্তন। চিন্তার পরিবর্তন আপনার আবেগ ও আচরণের পরিবর্তন নিয়ে আসবে; যা ইতিবাচক জীবন যাপনে সাহায্য করবে।
ইতিবাচক জীবনযাপন মানে হলো—
সংকট এলে সেটাকে স্বীকার করা- ভেঙে না পড়ে উত্তরণের জন্য স্বাস্থ্যকর চেষ্টা করা
আবেগকে বোঝার চেষ্টা করা- নিজের আবেগকে যথাযথভাবে প্রকাশ করা ও অপরকে তার আবেগ প্রকাশের সুযোগ দেয়া
কষ্ট ও সংকটের মধ্যেও সঠিক ও কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে শেখা
লেখক: ডা.হেলাল উদ্দিন আহমেদ , অধ্যাপক, চাইল্ড এডোলেসেন্ট ও ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ, ফরিদপুর।