প্রণয় আঞ্জুস্

আকালের কবিতা

ভেঙে যাওয়া মেরুদন্ডটি, শকুনের আচঁড়ে ছিন্নভিন্ন পতাকায় মুরে 

রেখে এসেছি গোরস্তানের মোড়ে। 

এখন থেকে প্লাস্টিকের মেরুদন্ডে জীবন চালাবো। 

আমার বিবেকের মৃত্যু হয়েছে, কেউ জানে, কেউ জানেনা। 

সত্যি বলতে আজকাল আর  বিবেকের মরণে কামান দাগেনা 

হো হো করে হাসে, উপহাস করে জায়েজ ধর্ষক। 

শুধু তার হাসিতে ভেঙে গেছে মাত্র আটটি বুলেট আর 

থ্রি-নট-থ্রির কংক্রিটের পরিচয় চিরন্তন। 

কতটা ভয় থাকলে এক প্রাণহীন কংক্রিটের যোদ্ধাকে ভয় পায়

কতটা আহাম্মক হলে নিজের নামের পদবি হয় পরাধীন?

জানি না। তবে কি কংক্রিটের বুলেটে ছিন্নভিন্ন মগজ, মজ্জা?

সগৌরবে যারা চাপিয়েছে গায়ে বিষাক্ত পোষাক 

সাম্যের নামে অমান্য করে যত মুখস্ত শপথ

শপথ শুনতে শুনতে আমিও শপথ করেছি,

রক্ত থেকে দ্রোহ ছুড়ে ফেলব এই বর্ষায়,

তারপর শীতল হবো বৃষ্টি বিলাসে। 

তবে তপ্ত রোদে চোখ এখনো জ¦ালা করে- কান্নায় নয়। অপমানে।

জ¦ালা-পোড়া করে, তবু অন্ধ হয়না এই পোড়া চোখ।

মুক্ত কবিতার ঘ্রাণে এখনো নিঃশ্বাস ভারি হয়ে ওঠে

নাকে ধক্ করে এসে লাগে বারুদ আর কিশোরীর পোড়া গন্ধ। 

অশরীর সাপের মতো গলায় পেঁচিয়ে ধরে 

বলাৎকার হওয়া বাচ্চা ছেলের পাজামার সাদা ফিতে। 

আহ্, তোমরা কত সহজে নারীকে বেশ্যা বলে ডাকো আফিমের মাদকতায়

নিখুঁত চোখে দেখো কার চামড়ার কয় ইঞ্চি দেখা গেলো ? 

কে তোমার ঠুনকো অনুভূতির কফিনে ঠুকেছে পেরেক 

কার কোন দোষে তারানো যাবে? কাকে বানাবে দালাল।

মুখে হরদম গালি, এইতো তোমার চিরকালিন পরিচয়।

ব্যবসার রঙিণ বিজ্ঞাপন! 

আফিমের ব্যবসা সফল,

কংক্রিটের জঙ্গল থেকে ফসলি জমিন, মানুষ থেকে অমানুষ

কবি থেকে সৈনিক, বিজ্ঞানী থেকে দিনমজুর

সবাই আফিমের খদ্দের। সবাই জিভ বেড় করে আছে লালোসায়।

চারদিকে আজ শেকড় পোড়া গন্ধ

তবুও নপুংসক শান্তি – কী আদিমতা!

পুনশ্চ ঃ

এই হাত একদিন কবিতা লিখতো

আজকাল কবরে শুয়ে লিখে বেঁচে থাকার আবেদন। 

ভেঙে যাওয়া মেরুদন্ডটি, শকুনের আচঁড়ে ছিন্নভিন্ন পতাকায় মুরে 

রেখে এসেছি গোরস্তানের মোড়ে।


হতাশার সূচকের ঊর্ধ্বগতি

সেই কবে গুলি লেগেছে হৃদয়ে

কবে ডিঙিয়েছি না পাওয়ার কাঁটাতার 

ছেড়ে দিয়েছি আকাঙ্ক্ষার কারবার। 

শেষ কবে তোমার হাতে কবিতা গুজে বলেছি 

ভালোবাসি! ভুলে গেছি, সব ভুলে গেছি।

কবে বলেছিলাম “গোলাপ আনবো পরে, আগে যুদ্ধটা শেষ হোক”। 

যদ্ধটাও তো আর শেষ হলো না। এদিকে দিনকে-দিন শুধু 

গোলাপের রং মিশে গেলো রক্তের সাথে। 

একটার পর একটা শহর পাল্টে আমি যাযাবরের খাতায় লিখিয়েছি নাম।

যে আমি সবকিছু এলোমেলো হাতে ক্যালেন্ডারের খোপে লিখে রাখতাম,  

সেই ক্যালেন্ডার, ডায়েরি জঞ্জালে মিশিয়ে বিক্রি করেছি সস্তা দামে। 

আজকেই সকালে ভেবেছিলাম   আমি আসবো তোমার শহরে। 

কিছুটা হেটে এসেও ছিলাম। 

শহরতলিতে আসতেই শুনি রাজপথ ছেয়েছে যুদ্ধবাজে। 

কনভয় বোঝাই করে শহর থেকে গ্রামে ছুটে যাচ্ছে ধূসর হিংসার বীজ। 

ফসলের মাঠ উজার। 

খবর পেলাম, নতুন করে আবারও প্রেম, কাম

সব লম্পটেরা কিনে নিচ্ছে ভীষন দামে। 

দেয়ালগুলো ছেয়ে গেছে চেতনার চাটুকার বিজ্ঞাপনে ।

তুমি কি রাস্তায় চোখ মেলে দেখো কবিতারা ক্ষুধার্ত

ফুটপাত ধরে মিষ্টি গল্পেরা আর হেঁটে যায় না আর।

অসহায়ের মতো রঙিন মলাটের দেয়ালে 

বন্দি রাজকন্যার মতো চোখের জলে 

ভাসিয়ে দিচ্ছে প্রেমের সাম্পান।

বলো, কোন অজুহাতে আমি বলি

এ শহরের উষ্ণতায়  নাগরিক হৃদয়ে প্রেমের জোয়ার আসবে?

সমতলে মিশে যাবে হতাশার সূচকের ঊর্ধ্বগতি।


যেদিন বসন্ত চলে যাবে

তোমার নিশ্বাসের গভীরতা মাপতে মাপতে আমি ভুলে গিয়েছিলাম 

গত জন্মে রেখে এসেছি কত শত পাপ।

আহারে! জীবন কত আনন্দ ধরে রেখেছে নীল কষ্টের আড়ালে।

রৌদ্রজ্জ্বল কারাগারের উঠোনে কত ঝিঁঝির গর্ত।

কার শৈশব মিশে গেলো সেই ঝিঝি শিকারী পাখির পিছনে ছুটে? 

কুয়াশার মত ধোঁয়ার ঝাপসা বিভ্রমে কখন চলে যায় বাসগাড়ি?  

সময় পুড়িয়ে বড় হয়ে  আর ফেরা হয় নিজের মতো বাড়ি?

কখন ছেড়ে যায় স্বপ্ন, মৃত বৃদ্ধা জবা গাছ কি স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে থাকে?

ফ্যাকাশে হলুদে লাল মেশানো  কাঁঠাল পাতায় 

সাজানো দুপুর গুলো ফিরে না আসুক আর কোনোদিন। 

স্মৃতি বড় কাতর করে! পুরো আকাশ জুড়ে এক অকারনে ভালো না থাকা পেয়ে বসে। 

বসন্ত ফিরে না আসুক শুধু ঋতু হয়ে। শুকনো মাটির বুকে

শিশির বিহীন রুক্ষতা নিয়ে বসন্ত না আসুক কোনো মূল্য ছাড়া।

যদি সত্যি সত্যি বসন্ত আসে আমাকে বলো,

আমি খুঁজে নেয়ে আসবো একমুঠো সুখের ঘ্রাণ

আবার যদি মিথ্যে  বসন্ত আসে 

আমাকে তোমরা বলে দিও, আমি পালিয়ে যাবো। 

তোমরা তখন প্রেমে ভিজে  উষ্ণতা খুঁজবে

পাতাহীন নগ্ন গাছেদের নির্বাক তাকিয়ে থাকায়।