অস্ত্র ছেড়েছি নাটক ধরেছি

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল নানা শ্রেণীর মানুষ। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিল্পী, সেনা সদস্য, পুলিশ মোট কথা সর্বস্তরের জনগণ। একটিই লক্ষ্য দেশ স্বাধীন করা। সেজন্য প্রচুর মূল্য দিতে হয়েছে।
১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সেই আকাঙ্খিত বিজয় ছিনিয়ে আনা হল। পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করলো যৌথবাহিনীর কাছে। আহ্ সে কি আনন্দ, সেকি ভোলা যায়। ভগ্নস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে দেশ গড়ার লক্ষ্যে সকলে মনোনিবেশ করলো। বঙ্গবন্ধু ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ সনে পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরে এলেন এবং দেশ বিনির্মানে ওঠে পড়ে লেগে গেলেন। যে যার কাজে ফিরে গেলেন। একদল নাট্য পাগল মানুষ যারা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন তারা গঠন করলেন নাট্যদল। তাদের মুখে একটা শ্লোগান ছিল- অস্ত্র ছেড়েছি নাটক ধরেছি।

কথা হলো আগে কি নাটক ছিল না?
হ্যাঁ ছিল অবশ্যই নাটক ছিল। তবে সেটা ছিল অনেকটা মান্ধাতার আমলের। মানে যাত্রা ঢংয়ের। তখনও নারীর চরিত্রে ছেলেরা অভিনয় করতো।
আমি বলছি ১৯৭২ সনের কথা। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় মঞ্চে নিয়ে এলো রবীন্দ্রনাথের বাকী ইতিহাস। দর্শনীর বিনিময়ে প্রথম বাংলা নাটক। নাটকটি নাট্য জগতে ঝড় তুললো। বেশ কয়েকটি নাট্য দল গড়ে উঠলো। থিয়েটার, নাট্যচক্র, আরণ্যক, ঢাকা থিয়েটার ইত্যাদি। নাটকের মোড় ঘুরে গেলো। আধুনিক নাট্য চর্চা বেইলি রোডের মহিলা সমিতির মঞ্চকে আলোকিত ও আন্দোলিত করলো। নাটক নিয়ে গবেষণা শুরু হলো। মঞ্চে এলো রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শেক্সপিয়ার, ব্রেকট, আন্তন চেখব, সফোক্লিসের কালজয়ী সব নাটক। দর্শক নন্দিত এসব নাটক দিন দিন জনপ্রিয় হতে লাগলো। দর্শকও বৃদ্ধি পেতে লাগলো।

সবচেয়ে বেশি দাগ কাটলো মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে নাটক নির্মাণ। সৈয়দ শামসুল হকের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় ভীষণ ভাবে নাড়া দিলো।
বাংলাদেশের নাটকের মান এতোটাই উঁচু মর্গে ওঠে গেলো যার প্রশংসা পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপা হলো। ওপারের বঙ্গবাসীরা নাটক দেখতে এপারে এলো।
তাই নির্দ্বিধায় বলা চলে আমাদের নাটক মুক্তিযুদ্ধের ফসল। স্বাধীনতার আরেকটি অর্জন আমাদের বাংলাদেশের নাটক। মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব গাঁথা আমাদের নাটক। জয় হোক নাটকের। সমাজ পরিবর্তনের মূখ্য হাতিয়ার হোক নাটক।
লেখক: বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব ও বীর মুক্তিযোদ্ধা।